কোটালীপাড়ায় জলমগ্ন কোটি টাকার মাছের ঘের

নিম্ন জলাভূমিবেষ্টিত গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন মাছ চাষ। গত রবি ও সোমবারের ভারী বর্ষণ  ও জোয়ারের পানির প্রবল চাপে  কোটালীপাড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ৮০ ভাগ মাছের ঘের ভেসে  অন্তত ১৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়।

কোটালীপাড়ায় বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে মাছের ঘেরের পর ঘেরবর্ষণের মধ্যে চাষিরা ঘের পাড়ে বানা, নেট, ধাপ দিয়েও ঘেরের মাছ রক্ষা করতে পারেননি।  সমস্ত ঘের তলিয়ে বিলের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। কোটালীপাড়ার হাজার হাজার মাছচাষির মধ্যে হাহাকার চলছে। মাছ হারিয়ে তদের মাথায় হাত পড়েছে। অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন। আগামী দিনগুলোতে পবিরাব পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবেন এ চিন্তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান।
কোটালীপাড়া উপজেলা মাছ অফিস  জানিয়েছে, এ বছর  ৫ হাজার ৮ শ’ ৯৫টি ঘেরে ও ১ হাজার ১ শ’ ২০ হেক্টর প্লাবন ভূমিতে  ১৫০টি পেনকালচারে মাছ চাষিরা মাছের চাষ করেন। মাছের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ঘেরে ৬ হাজার ১ শ’ ৬৪ মেট্রিক টন ও পেনকালচারে  ২ হাজার ২ শ’ ১০ মে. টন। লক্ষ্যমাত্রার মোট ৮ হাজার ৩ শ’ ৭৪ মে. টন মাছের বাজার দর প্রায় ১৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে ৮০ ভাগ মাছের ঘের ভেসে অন্তত ১৪ কোটি  টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষকরা দাবি করছেন।
কোটালীপাড়া উপজেলার তারাকান্দর গ্রামের মাছচাষি ও স্কুল শিক্ষক সুব্রত মধু বলেন, এ উপজেলায় ঘের ও পেনকালচরে  ৮ হাজার ৩ শ’ ৭৪ মে. টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মাছ বিভাগ। এ মাছের বাজার দর প্রায় ১৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে ৮০ ভাগ মাছের ঘের ভেসে অন্তত ১৪ কোটি  টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

কোটালীপাড়া উপজেলার ভেন্নাবাড়ি গ্রামের মাছচাষি প্রভাষ বৈরাগী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১২টি ঘেরে মাছ চাষ করেছিলাম। এছাড়া সঞ্চিত সমস্ত টাকা মাছের পেছনে বিনিয়োগ  করেছিলাম। বৃষ্টিতে  সবগুলো ঘের থেকে ৫০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। আমি এখন সর্বস্বান্ত। কিভাবে ঋণের টাকা শোধ করবো ?  পরিবার পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবো সে দুঃশ্চিন্তায় এখন আমি দিশেহারা।

ভারী বর্ষণে একাকার মাছের ঘেরকোটালীপাড়ার তারাকান্দর গ্রামের মাছ চাষি বিশ্বনাথ বৈদ্য বলেন, আমার ৬ বিঘার ঘেরে চিংড়ি ও ৫০ বিঘার ঘেরে রুই, কাতল মাছ ছিলো। আশা ছিলো এ বছর ৫০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করবো। কিন্তু মাছ ভেসে গিয়ে আমার সর্বনাশ হয়েছে। ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখছি। এখন হয় এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে হবে, না হয় আত্মহত্যা করতে হবে।
কোটালীপাড়ার গৌতমের আবাদের মাছচাষি সুমনা মল্লিক, শুকদেব হালদার, মধুসূধন বাড়ৈ, অমৃত রায়, বিপুল রায় বলেন, ভারী বর্ষণ  ও জোয়ারে পানির প্রবল চাপ ছিলো। ঘের পাড়ে বানা, নেট ও ধাপ দিয়েও ঘেরের মাছ রক্ষা করতে পারিনি। পানির তীব্র  স্রোতে ঘেরের পার ভেঙে তলিয়ে যায়।
কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উত্তম কুমার বাড়ৈ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের মানুষের প্রধান পেশা মাছ চাষ। ব্যাংক, ক্রেডিট ইউনিয়ন, মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ করে ও নিজের সঞ্চিত অর্থ  বিনিয়োগ করে তারা মাছ চাষ করে ভাগ্যের পরিবর্তন  করেছে। এবছর তারা অরো বেশি মাছের চাষ করে। কিন্তু বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে মাছ ভেসে গেছে। এ অবস্থায় সর্বশান্ত হয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অনেকেই ঋণের চাপে এলাকা থেকে পালিয়ে যাবেন। উপজেলাটি প্রধানমন্ত্রীর নিজ উপজেলা। ব্যংক ঋণ মওকুফ  করে প্রধানমন্ত্রী তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে মাছচাষিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।’
কোটালীপাড়া উপজেলা সিনিয়র মাছ কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার সরকার বলেন, ‘আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে করছি। এখন পর্যন্ত  ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ৪/৫ দিনের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো।  তবে ৮০ ভাগ মাছের ঘের  ও পেনকালচার ভেসে গেছে বলে তিনি জানান। এতে মাছচাষিদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।’

/এইচকে/

পড়ুন: ‘গ্যাস নিঃসরণে দেড় কোটি টাকার মাছের ক্ষতি’