বেলাল হোসেনের বয়স তখন ৫ বছর। একদিন বাড়ির পাশে খেলার সময় তাকে অপহরণ করে নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। এরপর কেটে গেছে এক যুগ। সেই বেলালের বয়স এখন ১৭। ঠিকমতো বাংলাও বলতে পারে না। মা-বাবার টানে এক যুগ পর সে দেশে ফিরে এসেছে ঠিকই। কিন্তু এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি বাবা-মাকে।
সেই শিশু বেলাল এখন সতের বছরের কিশোর। এই এক যুগে সে তার ভাষা ভুলে গেছে। কথা বলে হিন্দিতে। সে জানিয়েছে, তার বাবার নাম জসিম উদ্দিন এবং মায়ের নাম সেলিনা। বাড়ি ঝালকাঠির বাইপাস এলাকায়। এতটুকু তথ্য সম্বল করে সে তার বাবা-মাকে খুঁজে ফিরছে। ছোটবেলার অন্য কিছুই মনে নেই তার।
এটুকু তথ্য নিয়েই ফেনী থেকে শুক্রবার রাতে ঝালকাঠির রাজাপুরের বাইপাস এলাকায় আসে বেলাল। স্থানীয় খসরু নামে এক সবজি বিক্রেতা তাকে আশ্রয় দিয়েছে। ওই আশ্রয়ে থেকেই বেলাল তার বাবা-মাকে খুঁজছে। স্থানীয় থানা পুলিশ এবং সাংবাদিকরাও বেলালকে তার পরিবারকে খুঁজে পেতে সাহায্য করছে।
বেলাল বাংলা ভাষা বুঝলেও কথা বলতে পারে না বাংলায়। সে বেলাল জানান, তার বাবা খুব সকালে বাড়ি থেকে কাজের জন্য বের হতেন। ফিরতেন গভীর রাতে। তবে কী কাজ করতেন তা মনে নেই তার। কাঁচা রাস্তার পাশে টিনের ঘরে মা-ই সবসময় তাকে আগলে রাখতেন। সেই বাবা-মার একমাত্র সন্তান ছিল। এরপর পাচারকারীর কবলে পড়ে তার জীবন থেকে হারিয়ে যায় বারোটি বছর। এই সময়ে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাকে। তবুও বাবা-মাকে ভুলতে পারেনি সে। এই এক যুগ লড়াই ও আপ্রাণ চেষ্টা করেছে মায়ের কাছে ফিরে আসার। এরপর আসামের গোহাটি পাহাড়ের মদের কারখানার দারোয়ানের কাছে কাকুতি মিনতি করে বের হয় বেলাল। পরে ফেনী থেকে স্থানীয় রানা নামে এক ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় ট্রেনে লক্ষ্মীপুর আসেন। সেখান থেকে লঞ্চে করে ভোলা ও বরিশাল হয়ে ঝালকাঠির রাজাপুর বাইপাস পৌঁছান।
তবে এই যাত্রার বেশিরভাগ সময়ই বেলালকে না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। বেলাল বলে, ‘আমি অনেক কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে এসেছি শুধু বাবা-মাকে ফিরে পেতে। আমি বাবা-মাকে ছাড়া আর কিছুই চাই না।’
রাজাপুরের সাংবাদিকরা বেলালের ঘটনা শোনার পর সবাই তার বাবা-মাকে খুঁজতে এরই মধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এলাকায় মাইকিংসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে।
রাজাপুর থানার পরিদর্শক (ওসি) শেখ মুনীর উল গিয়াস জানান, ‘বিষয়টি অত্যন্ত নির্মম। বিষয়টি ঝালকাঠি পুলিশ সুপারকে অবহিত করেছি। বেলালের পরিবারকে খুঁজে বের করতে থানা পুলিশ সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে।’
ইউএনও শাহ মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বেলাল হোসেনের পরিবারের সদস্যদের পেলে উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে তাকে নিতে হবে। অন্যথায় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে তাকে সেফহোমে পাঠানো হবে।
/এসটি/এইচকে/
পড়ুন: ঝালকাঠির বিশখালী নদীর ভাঙন অব্যাহত, নেই বেড়িবাঁধ
পড়ুন: অজ্ঞাত লাশটি ছিল ইউপি চেয়ারম্যান কাশেমের