‘কাফের-মুশরেক হত্যা করলে আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের সুযোগ পাবে’

সিরাজগঞ্জে ডিবি পুলিশের হাতে আটক জেএমবি’র আত্মঘাতী শাখার চার নারী সদস্যের মধ্যে তিন জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, জেএমবি’র পলাতক নেতা ফরিদুল তাদের বলেছে, ‘আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে কাফের-মুশরেক হত্যা করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভের  সুযোগ পাবে।’এ কথা বলে তাদের দলে ভেড়ানো হয়।

সিরাজগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলামের আদালতে মঙ্গলবার ওই তিন নারী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। স্বীকারোক্তিতে তারা নিজেদের জেএমবির আত্মঘাতী শাখার সদস্য বলেও পরিচয় দেয়।

স্বীকারোক্তিতে তারা বলেছে,বগুড়ার শেরপুরের কুঠিবাড়িতে সম্প্রতি বোমা বিস্ফোরণে নিহত সিরাজগঞ্জের জামুয়া গ্রামের  জঙ্গি নেতা তরিকুল ইসলাম ও কাজিপুর উপজেলার বরইতলা গ্রামের ফেরার জেএমবি নেতা ফরিদুল ইসলামের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র আত্মঘাতী শাখার  সদস্য হিসাবে তারা কাজ করছে। ভাল ঘরে বিয়ে এবং ঘর-সংসারের পর ফিদায়ী জিহাদ বা আত্মঘাতী হামলার মাধ্যমে কাফের-মুশরেক হত্যা করলে আল্লাহর নৈকট্য লাভের  সুযোগ পাবে, এ কথা বলে তাদের দলে ভিড়ানো হয়।

জিহাদের মাধ্যমে মৃত্যুর পর  বেহেস্তে যাবার কথা বলে তাদের প্রলোভন দেখানো হয়। জেএমবির শীর্ষ নেতা জামুয়া গ্রামের তরিকুল মৃতুর আগে  একাধিকবার বরইতলা গ্রামে এসেছিল। মূলত সে-ই পলিটেকনিক ইন্সিটিউিটের ছাত্র ফরিদুলকে প্রথমে প্ররোচিত করে। এরপর ফরিদুলের পরিবারের সদস্যরাসহ ওই গ্রামের বেশ ক’জন একে একে জেএমবি’র কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

মঙ্গলবার আদালতের কাছে ফেরার জেএমবি নেতা ফরিদুলের বোন শাকিলা খাতুন ও সালমা খাতুন এবং প্রতিবেশী কাঠমিস্ত্রি রফিকুলের স্ত্রী রাজিয়া খাতুন এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছে। সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বাংলাট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন,‘স্বীকারোক্তি দেওয়ার এক পর্যায়ে জেএমবি’র তিন নারী সদস্যই আবেগ আপ্লুত হয়ে নিজেদের বোকামি বুঝতে পেরেছে বলে আদালতকে জানায়।’

পুলিশ সুপার আরও জানান,‘সিরাজগঞ্জে গত এক বছরে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র ২১ জন সদস্য পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জন নারী সদস্য।এই ৮ জনের মধ্যে ৪ জন আত্মঘাতী শাখার সদস্য ।এই জঙ্গিরা সবাই বগুড়ার শেরপুরের কুঠিবাড়িতে  বোমা বিস্ফোরণে নিহত সিরাজগঞ্জের জামুয়া গ্রামের আলোচিত জঙ্গি তরিকুল ইসলামের অনুসারী।’

তিন নারীর স্বীকারোক্তির বরাতে পুলিশ সুপার জানান, ‘জঙ্গি তরিকুলই ছিল এদের মূল হোতা। তার প্ররোচনায় এরা সিরাজগঞ্জে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তরিকুল ও তার ভাগিনা রায়হানের প্ররোচনায় কাজিপুর উপজেলার বরইতলা গ্রামের  ফরিদুল ইসলাম প্রথমে জেএমবিতে যোগ দেয়। পরে ফরিদুলের মা ফুলেরা বেগম, বোন শাকিলা ও সালমা খাতুন এবং প্রতিবেশী রফিকুলের স্ত্রী রাজিয়া খাতুনসহ অন্যান্যরা জেএমবি’র আত্মঘাতী শাখায় যোগ দেয়।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘তরিকুল মৃতুর আগে তার ভাগিনাসহ  বরইতলা গ্রামে এসে ফরিদুল ও তার বোনদের সাথে জেএমবির সাংগঠনিক বিষয় নিয়েও গোপন বৈঠক করে। ফরিদুলের মা-বাবা জেনেশুনে ছেলে-মেয়েদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। তরিকুল নিহত হওয়ার পর পুলিশ তার ভাগিনা রায়হানসহ পরিবারের বেশ ক’জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা এখন বগুড়ার কারাগারে রয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার। ’

পুলিশ সুপার মিরাজ আরো বলেন, ‘তরিকুল ও ফরিদুল সিরাজগঞ্জে জঙ্গি নেটওয়ার্কের কাণ্ডারি ছিল, যা আগে আমরা জানতে পারিনি। সম্প্রতি বগুড়ার শেরপুরে বোমা বিস্ফোরণে তরিকুল নিহত হওয়ার পর তাদের কর্মকাণ্ড পুলিশের নজরদারিতে আসে। এর মধ্যেই ফরিদুল গা-ঢাকা দেয়। বর্তমানে সে পলাতক।’

উল্লেখ্য, পুলিশ সুপারের নির্দেশে গত সোমবার ভোররাতে কাজিপুর উপজেলার বরইতলা গ্রামে জেএমবির ফেরার নেতা ফরিদুলের বাড়িতে অভিযান চালায়  সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি দল। এ সময় জিহাদি বই, সিডি ও কম্পিউটারসহ ফরিদুলের মা ফুলেরা বেগম এবং তার দু’বোন শাকিলা খাতুন ও সালমা খাতুনসহ প্রতিবেশী কাঠমিস্ত্রি রফিকুলের স্ত্রী রাজিয়া খাতুনকে আটক করে।

পুলিশ চার নারী সদস্যকে আটকের কথা স্বীকার করলেও অভিযানের পর থেকে ওই গ্রামে  দু’জন নিখোঁজ রয়েছে। তারা হলেন কাঠমিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম এবং তার প্রতিবেশী স্বর্ণকার আব্দুল আজিজের অনার্স পড়ুয়া মেয়ে আকলিমা খাতুন।

এলাকাবাসীর দাবি, বরইতলা গ্রাম থেকে ডিবি পুলিশ ছয় জনকে আটক করেছে। কিন্তু, ডিবি পুলিশের সেকেন্ড অফিসার রওশন আলী, অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি)ওয়াহেদুজ্জামান এবং পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এই চার নারীর আটকের কথাই স্বীকার করেন।

এপিএইচ/

আরও পড়ুন:

‘তালি আমার ব্যাটাসহ বাকি দু’জন গেল কোনে’