চালের লোভে ডিলারও হতদরিদ্র!

খুলনায় ১০ টাকার চাল বিতরণখুলনায় হতদরিদ্রদের কাছে ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রিতে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন অভিযোগও উঠেছে যে, এই চালের ডিলারও হতদরিদ্রের তালিকায় নাম ঢুকিয়েছেন। এ ছাড়া তালিকায় আছে প্রবাসী ও ব্যাংকারের বাবাসহ অনেক বিত্তবানের নাম। চাল দেওয়া হয়েছে একই পরিবারের চারজনকে। এসব অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে কোথাও কোথাও চাল বিক্রি স্থগিত রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

দিঘলিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে দেখা গেছে, হতদরিদ্রের তালিকায় ব্রহ্মগাতি গ্রামের প্রবাসী ছেলের পিতা জালাল শেখের নাম আছে। নাম আছে একই পরিবারের চারজনের। এরা হলেন আব্দুর রহিম, শাহীন, রুনা ও রিনা। তালিকায় নাম আছে ওই গ্রামের বহুতল ভবনের মালিক মো. শহীদ ও ধনাঢ্য কালাম সরদারের।

দিঘলিয়া উপজেলা সদরের মানিক মিয়া ও অশোক কুমার অভিযোগ করেন, ডিলাররা ১০ টাকা কেজির চাল ১৩ টাকা করে নিচ্ছেন। কেউ ৩০ কেজি চাল নিলে ৩০০ টাকার পরিবর্তে নেওয়া হচ্ছে ৪০০ টাকা।

দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়নের ডিলার এস এম গোলাম রহমান বলেন, বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিলারদের ডেকে তালিকা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত চাল বিক্রি বন্ধ রাখতে বলেছেন।

দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, ‘তালিকায় ঝামেলা আছে। এ কারণে চাল বিক্রি বন্ধ রাখতে বলেছি। তালিকা সংশোধন করে চাল বিতরণ পুনরায় শুরু করা হবে।’ এ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে ৭ হাজার ৪১৫ জন উপকারভোগীর তালিকা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।

দাকোপের কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের তালিকায় ভিজিডি কার্ডধারী, বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত, বাড়ি ও জমির মালিক, প্রবাসী, চাকরিজীবী ও বিত্তবানেরা রয়েছেন। ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মলিনা জোয়াদ্দার জানান, এ ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের রামনগর ঠাকুরবাড়ি এলাকার তালিকায় পলাশ গাইন, মানষ গাইন, ধীরাজ মণ্ডল, তার স্ত্রী মলিনা মণ্ডল, দিপক রায়, বিমল রায় ও রণজিৎ গাইনকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পলাশ গাইনের ভাই বিলাশ গাইন দুবাই প্রবাসী। তার পিতা অরুণ গাইন স্থানীয় বিনাপানি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। এ ছাড়া তার নিজের জমি রয়েছে। একইভাবে মানষ গাইনের ভাই তাপষ গাইনও সৌদি প্রবাসী। দিপক রায়ের স্ত্রী মিরা রায় ওমানে থাকার পরও তাকে ভিজিডির মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ১৬ বিঘা জমি থাকলেও তার স্বামী দিপক রায়কে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড দেওয়া হয়েছে। বিমল রায় ২২ বিঘা জমির মালিক।  এ ছাড়া এক ছেলে সৌদি প্রবাসী ও আরেক ছেলে ব্যাংকার হলেও বাবা রণজিৎ গাইন হতদরিদ্র হিসেবে কার্ড পেয়েছেন।

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৃনাল কান্তি দে জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর তালিকা যাচাই-বাছাই করে ১ হাজার ৫৫৬ জন থেকে ১৫৪ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. বজলুর রহমান গাজী জানান, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়নের তালিকা না পাওয়ায় চাল বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে।

খুলনায় দেওয়া হচ্ছে চালঅভিযোগ পাওয়া গেছে, পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের ১৮৬৭টি হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকায় এক ডিলার দম্পতিসহ একাধিক সচ্ছল ব্যক্তির নাম রয়েছে। ডিলার খান দেলোয়ার হোসেন (ক্রমিক নং ৭৪৫) ও তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম (ক্রমিক নং ৭১২) এর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহবুবুর রহমান খান বলেন, খুলনার ৯টি উপজেলায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের জন্য ৮৩ হাজার ৯৪৪ জনের তালিকা করা হয়েছে।

পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ উল মোস্তাক জানান, ডিলার দেলোয়ার খান এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার ভিত্তিতে জেলা প্রশাসককে রিপোর্ট দেওয়া হয়। এরপর ডিসির পক্ষ থেকে তার ডিলারশিপ বাতিলসহ মামলার করার জন্য আজকে (১১ অক্টোবর) নির্দেশনা পেয়েছেন।  এছাড়া ডিলার হিসেবে দেলোয়ার খানের নাম যারা প্রস্তাব করে তালিকাভুক্ত করেছিল তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে। 

এদিকে, কপিলমুনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাউসার জোয়ারদার জানান, ডিলার দেলোয়ার খানের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য ইউএনও তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

/এআরএল/বিটি/আপ-এসএনএইচ/