দিনাজপুরের উপশহর এলাকার তৈয়বা মজুমদার রেড ক্রিসেন্ট রক্ত কেন্দ্রের দোতলায় রয়েছে একটি রেস্ট হাউজ। স্থানীয়রা এই রেস্ট হাউজটিতে ‘টর্চার সেল’ হিসেবেই জানে। মাদকের চালান গ্রহণ, পাওনা টাকা আদায়, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের বিরোধিতাকারীদের নির্যাতন করা হয় এখানে। শুধু নির্যাতনই নয়, টর্চার সেলে নারীদের নিয়ে আমোদ-ফুর্তিসহ মাদক সেবনের আসর বসানোর অভিযোগ আছে। আলোচিত এই টর্চার সেলের মূল নায়ক হলেন দিনাজপুরের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রানা। এখানেই ২৫ অক্টোবর রাতে রানা ও মামুনের নেতৃত্বে মঞ্জরুল নামে এক তরুণের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ নভেম্বর (মঙ্গলবার) মারা যান মঞ্জুরুল।
রানার টর্চার সেলের কথা শহরের সবারই জানা।কেবল পুলিশের তা অজানা, এ দাবি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার।
এমনকি টর্চার সেলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন রেড ক্রিসেন্ট পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আলতাফুজ্জামান মিতা। তিনি বলেন,‘এসব ঘটনা তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে একটি তদন্ত দল দিনাজপুরে আসার কথা রয়েছে।’ তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বলে জানান তিনি।
তৈয়বা মজুমদার রেড ক্রিসেন্ট রক্ত কেন্দ্রটি ২০০৫ সালে বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়।এটি রেড ক্রিসেন্টের জেলা শাখা।কেন্দ্র থেকে সরাসরিভাবে পরিচালিত হলেও স্থানীয়ভাবেও একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, গত বছরের ১১ নভেম্বর নতুন পরিচালনা কমিটি রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্রটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় তলার রেস্ট হাউজটি দখলে নেয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রানা। তার নেতৃত্বে এখানে বিচার-সালিশ হয়। নির্যাতনের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হয়। কেউ চাঁদা না দিলে তাকে ধরে নিয়ে এসে নির্যাতন করা হয়। মাঝে মাঝেই মেয়েদেরকে নিয়ে এসে ফুর্তি করা হয়।মাদকের সেবন চলে রাতভর। এখানে যে নির্যাতন হয় তা বর্ণনাতীত।
তিনি বলেন, বৈদ্যুতিক তার দিয়ে পেটানো, ইট দিয়ে পা থেতলে দেওয়া, আঙুলের নখ তুলে ফেলা, ব্লেড দিয়ে চিরে লবন ও মরিচ লাগিয়ে দেওয়া, গরম পানির বোতল দিয়ে পেটানো, এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। রানার একটি বাহিনী আছে। মিথুন, রিকো, মির্জা মামুনসহ ৪/৫ জন রয়েছে ওই বাহিনীর মূল নেতৃত্বে। ’
তিনি বলেন, তাদের কথার বাইরে গেলে স্টাফদেরকেও মারধর করা হয়। স্টাফদের কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ধমক দিয়ে বলা হয়, চাকুরি না করে বাড়িতে বসে থাকতে, আর মাসে মাসে এসে বেতন তুলে নিতে।
বিষয়টি রেড ক্রিসেন্টের হেড অফিসকেও জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে স্থানীয় কমিটির অর্ধেকেরও বেশি সদস্য এখন আর এখানে আসেন না।
প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ রাজু আহমেদ জানান, ‘গত এক বছর আগে নতুন কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রানাকে ‘একটু ছাড়’ দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই ‘একটু ছাড়’ই এখন বড় আকার ধারণ করেছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রানা বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। পাওনা টাকা আদায়, মাদক ব্যবসা ও সেবন, নারী ঘটিতসহ বিভিন্ন অপকর্ম হয় এখানে।’
কমিটিকে একাধিকবার জানানোর পরও রানার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং এসবের প্রতিবাদ করায় রানা তাকে হুমকি দিয়েছে বলে জানান রাজু আহমেদ।
রাজু আহমেদ জানান, এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে রেড ক্রিসেন্টের হেড অফিসে বদলির আবেদন করেন তিনি।তার বদলির আদেশ হয়েছে এবং নতুন কর্মস্থল রাঙ্গামাটি জেলায়। তবে এখনও তিনি দিনাজপুরের ইনচার্জের দায়িত্বেই রয়েছেন। বিষয়টির সুরাহা হলে তিনি দিনাজপুরেই থেকে যাবেন।
বেগম তৈয়বা মজুমদার ব্লাড ব্যাংক পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আলতাফুজ্জামান মিতা জানান, ‘এখানে অনেক আগে থেকে এসব কার্যক্রম হয়, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। বিষয়টি যেহেতু এখন প্রকাশ পেয়েছে, তাই অনেকেই এটি রটাচ্ছে। নির্যাতনে যুবকের মৃত্যুর মূল বিষয়টি আড়াল করতে এসব রটানো হচ্ছে।’
তিনি জানান, ‘রেস্ট হাউজে নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে আমি শুনেছি কিছুদিন হলো। এর প্রতিবাদও করেছি। কিন্তু কোনও বড় নেতার ইন্ধনে রানা এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’
মিতা বলেন, ‘এসব বিষয়ে রেড ক্রিসেন্টের কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটিকে অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে কেন্দ্রীয় পরিচালনা কমিটির তদন্ত দল দিনাজপুরে আসছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা ঘটলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা রহস্যজনক।তাদের গাফিলাতি আছে। তারা প্রকৃত অপরাধীকে আটক করছে না। এর আগে র্যাব রানাকে আটক করে নিয়ে গেলেও পরে ছেড়ে দিয়েছে।পুলিশও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।একারণে রানা এসব অপকর্ম করার সাহস পেয়েছে।’ প্রকৃত অপরাধীকে আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানান তিনি।
এদিকে এ ঘটনার পর মঙ্গলবার বিকেলে র্যাব সদস্যরা অভিযুক্ত মির্জা মামুনকে তার শ্বশুরবাড়ি বড়বন্দর এলাকা থেকে এবং তৈয়বা মজুমদার ব্লাড ব্যাংকের গার্ড সুজনকে দায়িত্বরত অবস্থায় আটক করে নিয়ে যায়। তবে এ বিষয়ে জানতে বারবার যোগাযোগ করা হলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি র্যাব দিনাজপুর সিপিসি ক্যাম্প-১ এর কমান্ডার মেজর আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ রাজু। অবশ্য এর আগেও নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত রানাসহ কয়েকজনকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয় র্যাব।
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেদওয়ানুর রহিম জানান, ‘এখনও পর্যন্ত নিহতের ঘটনায় কেউ কোনও অভিযোগ দায়ের করেননি। তবে মৃত্যুর কারণ জানতে নিয়মের মধ্যে থেকে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কেউ অভিযোগ দিলেই সেটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা হবে।’
দিনাজপুরের পুলিশ সুপার হামিদুল আলম বলেন, ‘আমি মাত্র ৩ মাস আগে দিনাজপুরে যোগদান করেছি। রক্ত কেন্দ্রের এসব ঘটনার কিছুই আমার জানা ছিল না। তবে কিছুদিন আগে স্থানীয় এক আ. লীগের নেতার মুখে এটি শুনেছি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে ।’
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দল হোক আর যাই হোক, আইন তার নিজ গতিতে চলবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, দলীয় পরিচয় দিয়ে সে কোনভাবেই ছাড়া পাবে না।’ অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রশাসন সব সময় সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন আগে সদর উপজেলার মহতুল্লাহপুর গাজার মারি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম (১৮) খোদমাধবপুর গ্রামের মির্জা মামুনের ট্রাকের হেলপার হিসেবে চট্টগ্রামে যান। সেখান থেকে ২৫ অক্টোবর (মঙ্গলবার) ফিরে আসার সময় রাস্তায় ট্রাকের চালক রেজাউল নেমে যান। ট্রাকটি নিয়ে মঞ্জুরুল ইসলাম ফিরে আসেন। কিন্তু ওইদিনর রাতে মঞ্জুরুল ইসলাম বাসায় ফেরেননি।২৬ অক্টোবর তার পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনে জানতে পারেন,মঞ্জুরুল ইসলাম দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে মঞ্জুরুলের কাছে জানতে পারেন,ট্রাকের মালিক মির্জা মামুন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের জেলা কমিটির নেতা সিরাজুল সালেকিন রানা, তরিকুলসহ ৫/৬ জন মিলে ওই রাতেই মঞ্জুরুলকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, ট্রাকে করে যে ইয়াবা চালান আনা হয়েছিল, তা কোথায়। বিষয়টি মঞ্জুরুল অবগত নয় জানালে তাকে রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকের রেস্ট হাউজে রানার টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সারারাত ধরে তার ওপরে নির্যাতন চালানো হয়।
পরিবারের অভিযোগ, মঞ্জুরুলকে গরম পানির বোতল ও বৈদ্যুতিক তার দিয়ে পেটানো হয়। এরপর প্লায়ার্স দিয়ে হাতের নখ তুলে ফেলা হয়। দুহাত ব্লেড দিয়ে কেটে লবন ও মরিচের গুড়া লাগানো হয়।এছাড়া, তাকে বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হয়েছে।
২৬ অক্টোবর সকালে র্যাব সদস্যরা গুরুতর আহতাবস্থায় মঞ্জুরুলকে সেখান থেকে উদ্ধার করে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতালে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে গেলে ১ নভেম্বর (মঙ্গলবার) সকালে তার মৃত্যু হয়।
এব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুকুজ্জামান চৌধুরী মাইকেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যিনিই জড়িত হোন না কেন, দলের পক্ষ থেকে কোনও প্রশ্রয় তিনি পাবেন না।’ ফারাকুজ্জামান আরও বলেন, ‘ওই রক্তকেন্দ্রে যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত হতো, তা আমাদের জানা ছিল না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’ আরেক অভিযুক্ত মামুনকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
নেপথ্যে ইয়াবার চালান:দিনাজপুরে টর্চার সেলে যুবককে হত্যার অভিযোগ আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে