নাসিরনগরে এখনও ভয়

নাসিরনগরে ফের হিন্দুদের বাড়িতে হামলা (ফাইল ফটো)

নাসিরনগরে পরিকল্পিত ভাবেই সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে আর প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে এখন পর্যন্ত তার আতঙ্ক মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে। নাসিরনগরের হামলা এলাকা পরিদর্শন করে আসা সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়েছে। ওই এলাকা পর্যবেক্ষণ করে আসা প্রত্যেকেই মনে করছেন, সেখানে যে ভয় ভীতি সন্ত্রাসের আবহ সৃষ্টি হয়েছে সেটা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যেকোনও মুহুর্তে আবারও পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। এর কারণ হিসেবে তারা মনে করছেন, একদিকে ভয় তৈরি হয়েছে মনে, আরেকদিকে যারা হামলা করেছে তাদের নেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের বাইরে নাসিরনগরে হামলার এলাকা পরিদর্শন করে এসেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, সাবেক বিচারপতিসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে তারা বলছেন, এলাকায় এখনও ভীতি রয়েছে। কোনও স্বাভাবিক চিত্র তাদের চোখে পড়েনি।
কারা এই উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন এমন প্রশ্নে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা বাংলাদেশকে সংখ্যালঘু মুক্ত করতে চেয়েছে বছরের পর বছর তারাই এ কাজ করেছে। তিনি দাবি করেন, নাসিরনগরে যে সমাবেশ থেকে হামলা হয়েছে সেই সমাবেশের আয়োজক ছিল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও হেফাজতে ইসলাম এবং সেখানে আওয়ামী লীগেরও একাংশ তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এই গোষ্ঠী একসঙ্গে স্বার্থের মিল ঘটিয়ে হামলার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির মনে করেন, ‘নাসিরনগরে ধর্মীয় উন্মাদনা এখনও বিরাজমান বলেই রসরাজ ফেসবুকে উস্কানি দেয়নি বলে মন্ত্রী ছায়েদুল হক বারবার বলার পরও তাকে দায়মুক্ত করা হয় না।’

নাসিরনগরে ফের হিন্দুদের বাড়িতে হামলা (ফাইল ফটো)

তিনি বলেন, ‘উন্মাদনার কারণেই আমাদের পক্ষ থেকে রসরাজকে আইনজীবী দিতে আগ্রহ দেখালেও কোনও আইনজীবীকে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি এবং জোর করে রিমান্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
রসরাজকে আদালতে হাজির করা এসআই এর কথা উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই পুলিশ আদালতে বলেছে রসরাজ সব স্বীকার করেছে, যেখানে রসরাজ জানেই না কিভাবে কী ঘটেছে। এখন যদি জোর করে তাকে স্বীকার করানো হয় সেই দায় কে নেবে? তিনি বলেন, নাসিরনগর এখনও অস্বাভাবিক। অথচ গণমাধ্যমে সংবাদ সম্মেলন করে অনেকেই স্বাভাবিক দেখাতে চাইছেন।’
হামলার এলাকা পরিদর্শন করে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেখানে যে ভীতির সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা দূর করতে প্রশাসনের যে বক্তব্য দেওয়া উচিত বা যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি তার কিছুই নেওয়া হয়নি। বরং জনপ্রতিনিধি যখন বলছেন, সব ঠিক আছে। কারো কোনও ক্ষতি হয়নি। এবং ওসি ও ইউএনও তাদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেছেন তখন আসলে ভিকটিমদের যাওয়ার কোনও জায়গা থাকে না। ফলে তাদের আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ নেই।’

নাসিরনগরে ফের হিন্দুদের বাড়িতে হামলা (ফাইল ফটো)পরিদর্শনে কী দেখেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উড়ো খবরের ওপর ভিত্তি করে যে হামলা হয়েছে সেটা বিস্মিত করার মতো। যদি কোনও সম্প্রীতির পরিবেশ থাকতো তাহলে এধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। সেখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ছড়ানো হয়েছে এবং সেটা যেন বলবৎ থাকে তার চেষ্টা করা হয়েছে এবং আমাদের কাছে অভিযোগ আছে প্রশাসন তাতে প্রত্যক্ষভাবে মদত দিয়েছে। যেটা ভীষণ শঙ্কার।’

নাসিরনগর পরিদর্শনে যাওয়া অনুসন্ধানী দলের একটি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। নারীদের হেনস্তা হওয়ার শঙ্কার কথা উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। সংগঠনের কর্মী রাখি সাহা এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘সেখানে আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলেছি আর তারা যে বিবরণ দিয়েছেন তার সঙ্গে প্রশাসনের বিবরণ মিলছে না। তখনই বোঝা যাচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে সরকারি তদন্তের ওপর আস্থা রাখা সম্ভব না।’ তিনি বলেন, ‘এলাকার ওসি, ইউএনওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু সেটা আসলে সমাধান না।’ তিনি বলেন, ‘নারীরা আমাদের জানিয়েছেন কীভাবে তারা নিজেদের এবং সন্তানদের রক্ষা করতে নদীর পার হয়ে সারারাত লুকিয়ে ছিলেন। তাদের আশ্রয় দিয়েছিল মুসলিম পরিবারই। তার মানে এখানে একধরনের উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে, ওখানকার পরিবেশটাই এরকম তা নয়।’
/ইউআই/এপিএইচ//টিএন/আপ-এসএনএইচ/

আরও পড়ুন: নাসিরনগরে হামলাকারীরা প্রকৃত মুসলমান না: হেফাজতে ইসলাম