সরেজমিনে গিয়ে, স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এখনও একটি পক্ষ থেকে তাদেরকে কারও কাছে মুখ না খোলার জন্য বলা হচ্ছে— সাঁওতালদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর ফলে শুক্রবারও এলাকায় বিরাজ করেছে থমথমে অবস্থা। এদিকে দুই সাঁওতাল নিহতের ঘটনায় এখনও কোনও মামলা হয়নি বলে জানা যায় প্রশাসনও এখন পর্যন্ত কোনও তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ধরনের সহায়তাও দেওয়া হয়নি বলেও জানা গেছে।
সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার সংলগ্ন সাঁওতাল অধ্যুষিত মাদারপুর গ্রামের অনন্ত কিসকু সাহেবগঞ্জ ফার্ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ৬ নভেম্বর থেকে আর স্কুলে যান যাচ্ছে না। আগামী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেওয়া হবে কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে।
শুধু অনন্ত না ওই গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির অপর শিক্ষার্থী প্রভাতী কিসকু, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী স্মৃতি মুরমু ও সীমান্ত মুরমু এবং দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট কলেজের ডিগ্রী দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাদারপুর গ্রামের মেরিনা সরেনসহ শতাধিক শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে এসেছে এমন অনিশ্চয়তা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না বলেও জানায়। মেরিনা সরেন (২০) বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বাড়ি থেকেই তিনি নিয়মিত কলেজের যাতায়াত করতেন। সম্প্রতি স্থানীয় কিছু লোকজন বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানোর ফলে কলেজে যেতে পারছেন না।
একই গ্রামের মুখি মুরমু (৪৫) বলেন, তার ছেলে রিপন মুরমু ক্লাস নাইনে পড়ে। ওর বই-খাতা পুড়ে গেছে। তাই স্কুল যাওয়াও বন্ধ হয়েছে।
তার পাশে গালে হাত দিয়ে বসা ফেরেজা বাস্কে (৪০)বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার সন্তান সীমান্ত মুরমুর বই-খাতা, স্কুলব্যাগ, কাপড়সহ অন্য জিনিসপত্র পুড়ে গেছে। দুইটা গরু, হাঁড়িপাতিল লুট হয়েছে।
সাহেবগঞ্জ ফার্ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল বাকি বলেন, সাঁওতাল পরিবারের প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এই স্কুলে পড়ছে। তারা এখন বিদ্যালয়ে আসছে না। এ নিয়ে একাধিক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, রবিবারের উচ্ছেদ ঘটনার পর থেকে ভয় ও অজানা এক আতঙ্কে তারা স্কুলে আসছেন না।
শিক্ষার্থীদের স্কুল কলেজে যাওয়া বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ হয়ে গেছে সাঁওতালদের স্বাভাবিক চলাচল, নিত্য কাজকর্ম, রুটিরুজির সন্ধান।
মাদারপুর গ্রামের মুগলু টুডু জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর তাদের সম্প্রদায়ের লোকজন ঘটনা স্থল ত্যাগ করে স্ব স্ব স্থানে চলে গেছেন। কিন্ত তারপরও স্থানীয় কিছু লোকজন বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে গরু-ছাগল লুটপাট করে নিয়ে গেছে এবং হুমকি দিয়ে গেছে। ফলে ওই গ্রামের শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজ ও হাটবাজারে যেতে পারছে না।
একই গ্রামের সাঁওতাল গৃহিনী ছানি বাস্কে (৩৫)বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ফার্মের জমিতে তোলা আমাদের ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কাপড়, ছাগল, হাঁস-মুরগি, ও চাল-ডাল পুড়ে গেছে। আমাদের এখন খাবার নেই। সকালে লবণ-চা খেয়েছি। দুপুর-রাতে কী খাব জানি না।
একই গ্রামের জোবা টুডু বলেন, রবিবারের (৬ নভেম্বর) ঘটনার পর থেকে আমরা বন্দি। গ্রাম থেকে বাইরে যেতে পারছি না। এখন বড় অসহায়। আমাদের পাশে কেউ এসে দাঁড়াতেও চাইছে না।
জয়পুর মেরি টুডু (৫৫) বলেন, স্বামীর অসুস্থতার কারণে আমাকে সংসারের কাজ করতে হয়। কিন্তু আমরা ভয়ে কোথাও যেতে পারছি না। খাওয়ার চাল ফুরিয়ে গেছে।
রবিবার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রংপুর চিনিকলের জমিতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে তীরবিদ্ধ হয়েছেন ৯ জন পুলিশ সদস্য এবং গুলিবিদ্ধ হন ৪ জন সাঁওতাল। এছাড়া তিনজন সাঁওতাল নিহত হয়েছেন বলে জানা যায়।
এ ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রবিবার রাতে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করে সাড়ে ৩শ’ জনকে আসামি দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন। এপর্যন্ত পুলিশ চার জনকে গ্রেফতার করেছে।
/ এইচকে/আপ-এসএনএইচ/