গোপালগঞ্জে ফসল বিন্যাস প্রকল্প এলাকাগোপালগঞ্জে এক সময় যে জমিতে চাষ হতো না সেখানে এখন সবুজ আর হলুদের সমারোহ। এখানের জমিতে বছরে এক বা ২টি ফসল আবাদ হতো। তবে ফসলের বিন্যাসে এক ফসলি জমি এখন তিন ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে কৃষকের জমির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে জমির মূল্যও। আর পরিবর্তন এসেছে কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থায়।
গোপালগঞ্জ বেসিনে ফসল উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্পের অক্লান্ত পরিশ্রম আর সঠিক ফসল বিন্যাসে এখন সেই সব জমিতে কৃষকরা বছরে ৩টি ফসল ফলাচ্ছেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোহালা গ্রামের কৃষক আসলাম আলী বলেন, ‘এ প্রকল্পের আওতায় আমন মৌসুমে রূপা আমন ৫৭, ৩৯ ও ৬২ জাতের ধান আবাদ করে হেক্টরে সাড়ে ৪ টন ফলন পেয়েছি। এরপর মসুর আবাদ করব। মসুর তোলার পর মুগ ডালের আবাদ করবো। এই তিন ফসলের আবাদ আমার ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে।’
গোপালগঞ্জে ফসল বিন্যাস প্রকল্প এলাকাগোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার কৃষক শের এ আজম খোকন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার চন্দ্রদীঘলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক চৌধুরী বলেন, ‘আগে আমরা বোরো ধান ও পাট আবাদ করতাম। রেবো ধান আবাদ করতে সেচ, সার ও কীটনাশক খরচ বেড়েছে। বাজারে ধানের দাম কম। এ কারণে বোরো চাষ করে লাভ হচ্ছিল না। এছাড়া পাট আবাদ করার পর জাগ দিতে প্রতি বছরইপানির সমস্যা হচ্ছিল। পাট জাগ দিতেও ব্যয় বেড়ে যায়। পাটের বাজার মন্দা যাচ্ছিল। এ অবস্থায় আমরা জমি চাষাবাদ নিয়ে লোকসানের দুঃশ্চিন্তায় ভুগছিলাম। আমাদের আর্থ সামাজিক আবস্থার উন্নয়ন ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধিতে আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডাল গবেষণা উপ-কেন্দ্র, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও গোপালগঞ্জ বেসিনে ফসল উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্প দুই বছর আগে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। তাদের পরামর্শে এখন আমরা একই জমিতে মসুর-মুগডাল-রোপা আমন চাষ করছি। কোনও কোনও কৃষক সরিষা-মুগডাল-রোপা আমন, ছোলা-বোনা আমন/ছোলা-পাট-রোপা আমনের আবাদ করছেন। নতুন চাষ পদ্ধতিতে আমরা অধিক ফসল ঘরে তুলে লাভের মুখ দেখছি। শুনেছি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পটি আরও কয়েকবছর আমাদের সঙ্গে কাজ করলে এলাকার কৃষি ও কৃষকের ব্যাপক উন্নতি হবে।’
গোপালগঞ্জে ফসল বিন্যাস প্রকল্প এলাকাযশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ফুকরা গ্রামের বাসিন্দা ড. কে.এম দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ প্রকল্পের বদৌলতে পিছিয়ে পড়া গোপালগঞ্জের এক ফসলী জমি ৩ ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে। কৃষকের জমির গুরুত্ব, জমির ইজারা ও জমির মূল্য বেড়েছে। কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ১০ হাজার কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে।’
গোপালগঞ্জে ফসল বিন্যাস প্রকল্প এলাকাগোপালগঞ্জ বেসিনে ফসল উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্পের সাইড কো অর্ডিনেটর নিখিল রঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘গোপালগঞ্জে জমিতে ফসল বিন্যাস করে এক বা দো-ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করায় কৃষকের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন এসেছে। ফসল বিন্যাসের ফলে কমেছে সেচ নির্ভরতা, বৃদ্ধি পেয়েছে ফলন। ফলে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ আবাদ পদ্ধতির পরিধি। সারা দেশে যেখানে ফসলের নিবিড়তা ২০১ শতাংশ। সেখানে কৃষিতে অধুনিক প্রযুক্তির ছোয়া না থাকায় এ জেলায় ফসলের নিড়িরতা ছিল ১৭৬ শতাংশ। গোপালগঞ্জের ৩৫/৪০ শতাংশ জমি উঁচু ও মাঝারি উঁচু। এসব জমিতে মসুর-সরিষা-ছোলা-শাক সবজি-গম আবাদ করা সম্ভব।’
গোপালগঞ্জে ফসল বিন্যাস প্রকল্প এলাকাগোপালগঞ্জ বেসিনে ফসল উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্পের পি.আই ও গাজীপুর ডাল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফ হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চাষাবাদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বোরো আবাদে প্রচুর সেচের দরকার হয়। দিন দিন পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির অবচয় রোধ করে জমির উর্বর শক্তি ঠিক রেখে পরিবেশেবান্ধব চাষাবাদের জন্য আমরা নতুন ফসল বিন্যাস করেছি। বোরা মৌসুমে আমরা কৃষকদের দিয়ে সরিষা, মসুর, ছোলার আবাদ করিয়েছি। এরপর তারা এ জমিতে মুগডাল চাষাবাদ করবে। মুগডাল ক্ষেত থেকে ওঠার পর স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট রোপা আমান ধানের চাষ করবে। এছাড়া তারা সরিষা-মুগডাল-রোপা আমন, ছোলা -বোনা আমন/ছোলা- পাট-রোপা আমনের চাষও করতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ফসল বিন্যাস পদ্ধতিতে একই জমিতে বছরে ৩টি ফসল ফলাতে সময় লাগছে ২৯০ থেকে ২৯৫ দিন। বছরে ৬৫ দিন জমি বিরাম পাচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ৩ ফসল চাষাবাদ করে কৃষক বাড়তি ফসল ঘরে তুলে লাভবান হচ্ছেন। ডাল, তৈলবীজ, ধানসহ সব ধরনের ফসল উৎপাদন করে কৃষক স্বয়ম্ভরতা অর্জন করছেন। এতে তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে।’
/এসএনএইচ/