কুষ্টিয়ায় অবৈধভাবে আখ মাড়াই, হুমকিতে চিনি কলের উৎপাদন

পাওয়ার ক্রাশার দিয়ে আখ মাড়াই করে চলছে গুড় তৈরিকুষ্টিয়ায় গুড় তৈরি করতে অবৈধভাবে ‘পাওয়ার ক্রাশার’ দিয়ে আখ মাড়াই করে চলেছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে কুষ্টিয়া চিনিকলের উৎপাদন মৌসুম উদ্বোধনের আগেই গুড় তৈরিকারকদের দৌরাত্মে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, মিল এলাকার ৮টি উপ-অঞ্চলের মধ্যে ৭টিতেই চলতি মাসের শুরু থেকে অবাধে বেআইনিভাবে আখ মাড়াই করে চলেছে মুনাফালোভী গুড় তৈরীকারকরা। এ পর্যন্ত ওই সব এলাকায় ৪৫টি পাওয়ার ক্রাশার অবৈধভাবে আখ মাড়াই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। গুড়ের মূল্য বেশি হওয়ায় মিল জোন এলাকার ভেড়ামারা, আল্লারদর্গা, কুমারখালী, মিরপুরের আমলা, মেহেরপুরের গাংনী, মধুপুর উপ-অঞ্চলসহ মিলগেট-বি উপ-অঞ্চলের আওতাধীন চরাঞ্চলে  সাম্প্রতিককালে অবৈধভাবে আখ মাড়াই উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। আখের অভাবে চিনিকলের উৎপাদন কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের অবৈধ মাড়াই কাজ অব্যহত রয়েছে। এসব মিল জোন এলাকায় অবৈধভাবে আখ মাড়াই প্রতিরোধে আইন থাকলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। এতে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ মেট্রিক টন আখ অবৈধভাবে মাড়াই হয়ে যাচ্ছে। ফলে লক্ষমাত্রা অর্জনে ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে।

আরও জানা গেছে, আগামী ২ ডিসেম্বর আখ মাড়াই মৌসুমের উদ্বোধন করতে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জানান, ‘আসছে মৌসুমে ৫২ হাজার ২শ’ মেট্রিকটন আখমাড়ায়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আখ অবৈধভাবে মাড়াই হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কষ্টকর হয়ে উঠবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনিভাবে কালের পরিক্রমায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আখের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ব এই ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি তার অতীত ঐতিহ্য হারাতে চলেছে। উৎপাদনে সক্ষমতা থাকা সত্বেও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।’

জানা গেছে, আখ দীর্ঘমেয়াদী ফসল হলেও এক সময়ে তা অর্থকরী ফসল হিসাবে বিবেচিত হত। বর্তমানে অন্য সব ফসল থেকে তুলনামূলক আখের মূল্য কম হওয়ায় এমনিতেই কৃষকরা আখচাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছে, যে কারণে ক্রমশই কমে আসছে আখচাষ। তবে, চিনিকল কর্তৃপরে তত্বাবধানে মিল জোন এলাকায় যে পরিমাণ আখের উৎপাদন নিশ্চিত করা হচ্ছে, তা থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪০ শতাংশ পরিমাণে আখ অবৈধভাবে গুড় তৈরীকারকদের হাতে চলে যাচ্ছে।

আখচাষীরা বলছেন, মিল গেটে সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ আখের মূল্য ১১০ টাকা যা অতি নগণ্য। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় এ মূল্যের সামঞ্জস্য নেই। তাই বেশি দামে আখ বিক্রি করতে ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছেন চাষীরা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে গুড় তৈরীকারকরা লাভবান হচ্ছেন। এভাবে প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিকটন আখ অবৈধভাবে মাড়াই হচ্ছে। ফলে উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

সদর উপজেলার মুল্লাতেঘরিয়া গ্রামের আখ চাষী সাবদেল আলী জানান, ‘আখ চাষে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়া, নতুন কোনও প্রযুক্তি না আসায় এবং এটি দীর্ঘ মেয়াদের ফসল হওয়ায় প্রতি বছর কমছে এ অঞ্চলে আখ চাষীর সংখ্যা। তাছাড়া এখানকার চাষীরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত পুরোনো আখের জাতের বীজই ব্যাবহার করছে। ফলে সারা বছর কষ্ট করেও ভালো ফলন পাচ্ছে না। এদিকে আখ চাষের ফলে জমির মাটি দুর্বল হওয়ায় ধান বা অন্য কোনও ফসল আবাদ করা যায় না। তাই জমি খালি ফেলে না রেখে আখের চাষ করেন তিনি। তবে এতে খুব একটা লাভ হয় না।’

মিপুর উপজেলার কেউপুর গ্রামের আখচাষী ওবাইদুল গণি জানান, ‘আখের ফলন পেতে কৃষককে প্রায় এক বছরের মতো অপেক্ষা করতে হয়। অন্যান্য ফসলের তুলনায় আখ ক্ষেতে অনেক বেশি পরিশ্রম ও পরিচর্যা করেও কৃষক খুব একটা লাভবান হয় না। তাছাড়া এখন কৃষকেরা চান কম সময়ের মধ্যে ফলন ফলিয়ে দ্বিগুণ লাভ করতে। এ কারণেই এ অঞ্চলের সাধারণ কৃষকেরা আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’

চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, ‘অবৈধভাবে গুড় তৈরীকারকদের আইনানুযায়ী শাস্তি দাবি করছি।’ৎ

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া চিনিকল আখচাষী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুর রহমান খয়বার জানান, ‘আখের ন্যায্য মূল্য পেতে ১১০ টাকার স্থলে সরকারের কাছে ১৫০ টাকা নির্ধারণে তাদের দাবি যুক্তিসম্মত। এ দাবি মানা হলে আখ চাষ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।  একই সঙ্গে আখচাষী ও চিনিকলের স্বার্থ রক্ষা হবে।’

/এসএনএইচ/