অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে খুলনার পাট শ্রমিকদের

পাটের এমন সোনালি দিন আর নেইখুলনার পাট-অঞ্চল বলে পরিচিত দৌলতপুরের কোম্পানিগুলো থেকে রফতানিকারকরা পাট না কেনায় বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক। কাজ না থাকায় অনাহার-অর্ধাহারে কাটছে তাদের দিন। শ্রমিক ও এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হারুন-অর-রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেলিং ওয়াকার্স ইউনিয়নের অধীনে ১২ হাজারের মতো শ্রমিক কাজ করেন। এদের সঙ্গে আরও প্রায় চার লাখ মানুষের জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু দৌলতপুর থেকে রফতানিকারকরা পাট না কেনায় বিপাকে পড়েছেন এই বিপুলসংখ্যক মানুষ।’
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাটিতে ১৩টি জুট প্রেসসহ আড়াইশ পাট রফতানিকারক কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে এখন হাতেগোণা কয়েকটি কোম্পানি পাট কিনে থাকে। এর ফলে বাকি কোম্পানিগুলোর শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন।
একই কথা জানান পাট রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান আকুঞ্জি ব্রাদার্সের মালিক হারুন-অর-রশীদও। তিনি বলেন, ‘দৌলতপুরে ১২টি রফতানিকারক কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ওইসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।’
আকুঞ্জি ব্রাদার্সের মালিক আরও বলেন, ‘গত মৌসুমে ভারতে পাটের উৎপাদন ভালো ছিল। যে কারণে বাংলাদেশের কাঁচা পাটের চাহিদা ছিল কম। এর ওপর স্থল বন্দরে ধর্মঘটসহ নানা কারণে গত ছয় মাস পাট রফতানি বন্ধ ছিল।’
শ্রমিক নেতা আফজাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকরা বছরে দুই থেকে তিন মাস কাজ করতে পারেন। বাকি সময় কাজ না থাকায় অলসভাবে দিন কাটান। রফতানিকারকরা পাট কেনা অব্যাহত রাখলে এমন হতো না।’
পাটকলের শ্রমিকদের ধর্মঘট (ফাইল ছবি)এই শ্রমিক নেতা আরও বলেন, ‘শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলে ব্যক্তি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির গোডাউন দেখিয়ে ব্যাংক থেকে পাট কেনার জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন রফতানিকারকরা। কিন্তু তারা আর পাট কেনেন না। তাই শ্রমিকরাও কাজ পান না।’
বিজেএ খুলনা সূত্রে জানা গেছে, বিদেশের বাজারে চাহিদা না থাকায় পাট রফতানি ৫০ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছর ১১ লাখ ৩৭ হাজার বেল পাট রপ্তানি হয়, যার মূল্য ১ হাজার ৫৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৬ লাখ ৯৭ হাজার বেল পাট রফতানি হয়েছে, যার মূল্য ৬শ ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। তাই ঋণের বোঝা টানতে না পেরে ৪৮ রফতানিকারক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
বিজেএ জানিয়েছে, ২০১০ সাল পর্যন্ত ৪২টি দেশে পাট রফতানি হয়েছে। কিন্তু ২০১১ সালের পর ভিয়েতনাম, জার্মানি, ফ্রান্স, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, জাপান, গুয়েতেমালা, জিবুতি, স্পেন, হল্যান্ড, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইরান, ইতালি, কিউবা, সাউথ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে পাটের রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে শ্রমিক ঠিকাদার শাহাবুদ্দীন আহম্মেদ বলেন, ‘ব্যাংকগুলো সঠিক সময়ে পাট কেনার জন্য রফতানিকারকদের ঋণ দেয় না। ফলে রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। ’ তিনি আরও বলেন, ‘পাটের দর ১২শ টাকা থেকে ১৫শ টাকা থাকলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয় না। কিন্তু ১৮শ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা হলে ঋণ দিয়ে থাকে।’ তাই শ্রমিকদের বেকার হয়ে পড়া ঠেকাতে রফতানিকারকদের সঠিক সময়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়া উচিত বলে দাবি করেন তিনি।
সোনালী ব্যাংক খুলনা শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দৌলতপুরের ১১ জন রফতানিকারকের কাছে ৬০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। তারা বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পরিশোধ করছেন না।

আরও পড়ুন-

নারী দিবসে নারীদের নেতৃত্বে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট

ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও খোলা আকাশের নিচে

/এমএ/টিআর/