পুলিশ ও এনসেনা বেগমের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে এনসেনা বেগমের সঙ্গে বিয়ে হয় দুলাল মিয়ার। চারটি সন্তান রয়েছে এই দম্পতির। দুলাল মিয়া রিকশা চালালেও বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই থাকেন। এনসেনা বেগম বাসাবাড়িতে কাজ করে এবং কাপড় সেলাই করে সংসার চালান। স্বামী কাজ না করায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় এনসেনা বেগমকে।
এ পরিস্থিতিতে এনসেনা বেগম এনজিও ব্র্যাক ও আশা থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নেন। এই টাকার কিছু অংশ দিয়ে তিনি সেলাই মেশিন কিনে বাকি টাকা স্বামী-সন্তানদের পেছনেই ব্যয় করেন। অভাবের সংসারে এনসেনা বেগম ঋণের কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে করতে পারেন না। কিস্তি পরিশোধে এনজিওকর্মীদের চাপের মুখে তিনি অন্যদের কাছ থেকে ঋণ নেন। এক পর্যায়ে এনজিও কিস্তি পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গে যোগ হয় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের বোঝা। এনজিওকর্মীসহ পাওনাদারদের চাপও ক্রমাগত বাড়তে থাকে।
এদিকে, পরিবারে ঋণের বোঝা তৈরি হওয়ার পরও দুলাল মিয়া রিকশা না চালিয়ে ঘরে বসে থাকায় দু’জনের মধ্যে ঝগড়া হয় বুধবার রাতে। ওই রাতেই এনসেনা বেগম তার নয় মাস বয়সী সন্তানকে রিফাতকে বিষপান করিয়ে নিজেও বিষপান করেন। এতে রিফাতের মৃত্যু হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ শিশু রিফাতের মৃতদেহ উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় এনসেনা বেগমকে আসামি করে দুলাল মিয়া বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে তাকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গ্রেফতার দেখাচ্ছে পুলিশ। তার চিকিৎসাও হচ্ছে পুলিশি প্রহরায়।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২ নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এনসেনা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার স্বামী কোনও কাজ করে না। সংসার আমাকেই চালাতে হয়। এর জন্য এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি। আরও অনেকের কাছে ধারদেনা হয়েছে। এসব ঋণ শোধ করতে পারি না। এ জন্য আমার স্বামী আমাকে কোনও সাহায্য করে না, বরং অত্যাচার করে। তাই আমি অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম।’
এনসেনা বেগমের ভাই সালাম মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুলাল মিয়া একদিন রিকশা চালালে সাত দিন বাড়িতে বসে থাকে। এনসেনা-ই বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে, কখনও কাঁথা সেলাই করে সংসার চালায়। এর বাইরেও সেলাইয়ের কাজের জন্য সে ব্র্যাক ও আশা থেকে ঋণ নিয়েছিল। কিন্তু পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে কিস্তির টাকা ঠিকমতো শোধ করতে পারত না। এনজিওর ঋণ শোধ করার জন্য প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও ধারদেনা করে এনসেনা।’ ঋণের বোঝা বেড়ে গেলে পাওনাদারদের চাপে টিকতে না পেরেই এনসেনা এই কাজ করেছে বলে জানান সালাম মিয়া।
এনসেনার প্রতিবেশী মনির উদ্দিন, জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, সংসার চালাতে গিয়েই ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন এনসেনা। একদিকে পাওনাদারদের চাপ বাড়ছিল, অন্যদিকে তার স্বামীও কাজ করত না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়েই এনসেনা সন্তানকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
বদরগজ্ঞ থানার ওসি আখতারুজ্জামান প্রধান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্তানকে হত্যা করে নিজের আত্মহত্যার চেষ্টা করার ঘটনায় এনসেনা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দুলাল মিয়া। এনসেনা বেগম সুস্থ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন জনের কাছে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে তিনি এ কাজ করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আমরা ঘটনা খতিয়ে দেখছি।’
আরও পড়ুন-
ঝুঁকিতে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা ব্রিজ
নারায়ণগঞ্জে চুরির অভিযোগে মাদ্রাসা ছাত্রকে পিটিয়ে আহত
/টিআর/