নববর্ষের আনন্দ নেই নেত্রকোনার বন্যা দুর্গত হাওরাঞ্চলে

হাওরে পানি এসে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলবাংলা নববর্ষের  উৎসবের আমেজ চারিদিকে। শহর থেকে শুরু করে গ্রামে সবখানেই নানা আনুষ্ঠানিকতায় পালিত হয়েছে পহেলা বৈশাখ। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে মাথায় হাত নেত্রকোনার হাওর অধ্যুষিত মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার লক্ষাধিক কৃষি নির্ভর পরিবারের। উৎসব তো দূরে, আগামী দিনগুলো পারি দেওয়ার চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

পহেলা বৈশাখ সরেজমিনে খালিয়াজুরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, এবছর বোরো ফসল কাটার আগেই হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে গেছে বোরো ফসল। একমুঠো ধানও গোলায় তুলতে পারেননি এ অঞ্চলের কোনো কৃষক। ঘরে খাবার মজুদ না থাকায় দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

ইতোমধ্যে সরকারিভাবে এসব ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ১৫৩ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ১১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসন। কিন্তু এসব অনুদান ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন দুর্গতরা। তাদের দাবি, সরকার যাতে এ অঞ্চলকে দুর্গত অঞ্চল ঘোষণার মাধ্যমে কৃষকদের কৃষি ঋণ মওকুফ, এনজিওর ঋণ শিথিল,কৃষকদের উন্নতমানের বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ, ১০টাকা কেজি মূল্যে চাল বিতরণ অব্যাহত রাখাসহ হাওরের সব বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ ও দুর্নীতিবাদ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তা ও অসাধু ঠিকাদারদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) খালিয়াজুরী উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার কৃষক নারী-পুরুষ বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা না করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এসব দাবি জানান।

আব্দুল আলিম নামে এক কৃষক জানান, ‘গত বছরও পহেলা বৈশাখে কি আনন্দ ছিল বাড়ি বাড়ি! ঘরে ঘরে পিঠা-পুলিসহ ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু আজ আমাদের মাঝে সেই আনন্দ নাই। এখন আমাদের ঘরে দু-বেলা খাবারের মত চালই নাই। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে সেই চিন্তায় আমরা দিশেহারা।’ তিনি দ্রুত সরকারকে সাহায্যের হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এসব অঞ্চলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গৃহপালিত প্রাণিগুলোও রয়েছে খাদ্য সংকটে। গো-খাদ্যে চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে অনেক কৃষক উপায় না দেখে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। আর পরিস্থিতির কারণে গৃহপালিত পশুর দামও মেনে এসেছে অর্ধেকের চেয়ে কম মূল্যে। অসাধু ব্যবসায়ীরাও জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।

শফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষক জানিয়েছেন, ‘বাজারে গরু বিক্রি করতে গেলে দাম পাই না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার চালসহ সব নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে প্রায় দিগুণ। আমরা কী করবো তাই ভেবে পাচ্ছি না।’ তিনি দাবি জানান, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে যাতে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার সব বাজার মনিটরিং এর ব্যবস্থা করা হয়।

এ ব্যাপারে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, তারা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক বাজার মনিটরিং করছেন যাতে কেউ অন্যায়ভাবে দাম বাড়াতে না পারে। যদি এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

খালিয়াজুরী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান তালুকদার সোয়েব সিদ্দিকী বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড ও তাদের নির্ধারিত ঠিকাদাররা সময় মতো কাজ করে না। ফলে পানি আসার আগে তারা কিছু মাটি কেটে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের সব টাকা আত্মসাৎ করে।’ তিনি খালিয়াজুরীর ধনু নদী খনন করে নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার এবং বেড়িবাঁধ সদস্যরার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।

/এফএস/

আরও পড়ুন-

মালিকদের ইন্ধনে কর্মসূচির ফাঁদে ট্যানারি শ্রমিকরা

বৈশাখে রঙ ছড়ানোয় খুঁটিতে বেঁধে শিশুকে নির্যাতন