বাবা-মেয়ের আত্মহত্যার পেছনে যত কারণ

 

সন্তান ও স্বামীকে হারিয়ে বিলাপ করছেন হালিমা বেগম গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবা-মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনার চার দিন পরও অভিযুক্ত ফারুককে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মেয়ের শ্লীলতাহানির চেষ্টা ও  গরু চুরির বিচার না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করতে হযরত আলী বাধ্য হন বলে জানান তার স্ত্রী হালিমা বেগম।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,  ‘কর্ণপুর গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে ফারুক আমার মেয়ে আয়েশাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সাইকেল ওঠায়। এরপর জোর করে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে যৌননির্যাতনের চেষ্টা করে। মেয়ে চিৎকার দেওয়ার পর সাইকেল রেখে পালিয়ে যায় ফারুক। এসময় সাইকেল থেকে পড়ে আমার মেয়ের পা কেটে গিয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘ফারুক সাইকেল রেখে পালিয়ে যাওয়ার সময় আমার মেয়ের পা কেটে যায়। সরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা করেনি।  পায়ে পচন ধরে ঘা হয়ে গিয়েছিল, ঘন ঘন চুলকাতো। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে মেয়েকে খাইয়েছি।’

হালিমা বেগম অভিযোগ করেন, ‘এই ফারুক আমার মেয়েকে দু’বার উঠিয়ে নিয়ে গেছে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথেও তাকে উত্যক্ত করে। এছাড়া ফারুকরা আমাদের একটি গরুও চুরি করেছে। গরুর দাম ৪০ হাজার টাকা।’  অভিযুক্ত ফারুকের গ্রামের দিকে আঙুল উঁচিয়ে হালিমা বলেন, ‘দাও লইয়া, লাডি লইয়া দৌড়াইয়া আইছে আমার স্বামীরে কুবাইতো বইল্যা। ডেগার যহন লইয়া আইছে আমার স্বামীডারে আমি ঘরের ভিত্তে আটকাইয়া রাকছিলাম। পরের দিনই ঘটনাটা ঘটছে। আমি আমার স্বামী চাই, মাইয়া চাই।’

হালিমা বেগম বলেন, ‘মেয়েকে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ফারুকের বাবা ফজলু মিয়ার কাছে বিচার চাইতে যান আমার স্বামী। কিন্তু ফজলু মিয়া কোনও বিচার করেননি।  বাধ্য হয়ে আমার স্বামী গোসিংগা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আবুল হোসেন ব্যাপারীর কাছে যান। ফারুকের কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে কোনও মীমাংসা ছাড়াই আবুল হোসেন মেম্বার বিষয়টি ধামাচাপা দেন।’ তিনি বলেন,  ‘মেয়ের নির্যাতন ও গরু চুরির  বিচার না পেয়ে হযরত আলী মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেন।’

এদিকে বাবা-মেয়ের আত্মহত্যা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রত্যক্ষদর্শী জুয়েনা আক্তার বলেন, ‘ওই দিন সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে (শ্রীপুরের পটকা) রিকশায় করে কিন্ডারগার্টেনে যাচ্ছিলাম। ট্রেন সিগনালে আটকে পড়ায় রিকশা থেকে নেমে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটা শুরু করি। স্টেশনে তিনটি রেললাইন। কিছুক্ষণ পর মাঝখানের লাইন দিয়ে হাঁটা শুরু করি। কিন্ডারগার্টেনের কাছাকাছি এসে দেখি একটি বাচ্চা মেয়ে স্কুলভ্যানের সামনে খেলা করছে। হঠাৎ একটা লোক এসে মেয়েটিকে ভ্যান থেকে হ্যাঁচকা টানে কোলে তুলে নিয়ে রেললাইনের দিকে এগুতে থাকেন। আমার সঙ্গে তার দূরত্ব ছিল ৫০ হাতের মতো। আমিও তাকে অনুসরণ করতে থাকি। সামনের দিক থেকে আসছিল দ্রুতগামী একটি ট্রেন। হঠাৎ দেখি, লোকটি তার মেয়েকে বুকে নিয়ে ট্রেনের সামনে সেজদার ভঙ্গিতে শুয়ে পড়েছেন। মুহূর্তেই ট্রেনটা তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়।’

এ ঘটনায়  নিহত হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম বাদী হয়ে ছয় জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল হোসেন (৪৭) ও তার ছেলে মিথুন (২৪) গ্রেফতার হলেও  অভিযুক্ত ফারুককে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। বাবা-মেয়ের আত্মহত্যার পর থেকে  ফারুক  পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ফারুকের ভাবি রিমি আক্তার জানান, ‘ওই দিন সকালে ফারুক কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। আর বাড়ি ফিরে আসেনি।’

হালিমা বেগম আরও বলেন, ‘আমার মেয়েকে নির্যাতনের পর থানায় অভিযোগ দিয়েছিলাম। স্যারেরা (এএসআই বাবুল) বলেছেন, তারা আসামি চেনেন না। এলাকায় আসামি তারা খুঁজে পান না। আসামি ধরতে পুলিশ এসেছিল রাত ১০টায়। আমি তো আর রাতের বেলায় পুলিশের সাথে যেতে পারি না।’ 

উল্লেখ্য, গত ২৯ এপ্রিল সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর রেলস্টেশনের পশু হাসপাতাল-সংলগ্ন এলাকায় মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন কৃষক হযরত আলী।

/এমএনএইচ/