ইয়াবা পাচার ঠেকাতে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রধানমন্ত্রীর

শেখ কামাল স্টেডিয়ামে জনসমাবেশে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী (ছবি- ফোকাস বাংলা)কক্সবাজার থেকে সারাদেশে ইয়াবা পাচারের দুর্নাম ঘোচাতে ইয়াবা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারের বদনাম রয়েছে, এখান থেকে নাকি সারা বাংলাদেশে ইয়াবা সরবরাহ হয়। এই ইয়াবা সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। এই ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। তাদের কোনোভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না।’
শনিবার (৬ মে) বিকালে কক্সবাজারের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কক্সবাজার শাখা আয়োজিত এক জনসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে প্রধানমন্ত্রী এখান থেকে একযোগে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও নয়টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জনসমাবেশে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাদক এক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই মাদকের ছোবলে মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। কোনও মানুষ যখন মাদক সেবন করতে শুরু করে, সে চিন্তা শক্তি হারায়, অসুস্থ হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে। কোনও বাবা-মা-ই চায় না, তার সন্তান এভাবে অকালে মৃত্যুর পথে চলে যাক।’ মাদকের ছোবল থেকে তাই দেশের সন্তানদের রক্ষা করার জন্য সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের কাছে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
মাদকের পাশাপাশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলার মাটিতে কোনোভাবেই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ চলবে না, চলতে পারে না। এর বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি।’
জনসমাবেশে বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি দুর্দিনেও নাই, উন্নয়নেও নাই। তারা নির্বাচনে না গিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। এর আগে তারা নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে ১৬৫ জনকে হত্যা করেছে। পরিবহন খাতে ৫৫ জন চালক-হেলপারকে হত্যা করেছিল, ৫৮২ স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে উন্নয়ন করি, বিএনপি ক্ষমতায় এসে হ্ত্যাযজ্ঞ চালায়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে কক্সবাজার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের সাত নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। তাদের পরিবারগুলোর ওপর নির্যাতন করেছে। উখিয়ার বৌদ্ধমন্দিরে আগুন দিয়েছে। ওই সময় বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছে। কক্সবাজারের হিন্দুপল্লীর বাড়িঘরে আগুন দেওয়াসহ পালপাড়া, টাইমবাজারে সংখ্যালঘুদের দোকান, বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে। ২০ হাজার একর বনভূমি বিএনপি ক্যাডাররা দখল করে নিয়েছে।’
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী (ছবি- ফোকাস বাংলা)কক্সবাজারে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনাদের সামনে খালি হাতে আসিনি। অনেক প্রকল্প নিয়ে এসেছি। যে কাজগুলো এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলো উদ্বোধন করেছি। যেগুলো করব, সেগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি।’
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা এই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, মেডিক্যাল কলেজসহ সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে কক্সবাজার একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে পরিণত হবে।’
জনসভায় কক্সবাজারের মহেশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র, টেকনাফে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন ও নাফ ট্যুরিজম পার্ক নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডুলাহাজারা থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন প্রকল্পের কাজ ও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লাইনে উন্নয়নের কাজ শুরু করা হবে। মহেশখালী দ্বীপে চর জেগেছে। এই এলাকারও উন্নয়ন করা হবে। আমরা গ্যাস সঞ্চালন লাইনের কাজ শুরু করেছি। শিল্পায়নের জন্য সারা বাংলাদেশে আমরা ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। সোনাদিয়া গভীর সমূদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।’ বাঁশখালীতে অর্থনৈতিক অঞ্চল-৩ গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজারের বিমানবন্দরে সুপরিসর বোয়িং বিমানে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী (ছবি- ফোকাস বাংলা)এর আগে কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরও ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। সুপরিসর বোয়িং বিমানে করে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু এখানে পর্যটক আসে, সেহেতু তাদের যাতায়াতের জন্য বিমান নিয়ে এসেছি। এই বিমান আজ কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রথম অবতরণ করলো। আমি এই বিমানের মাধ্যমে এখানে আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনার ঘোষণা দিলাম।’
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফার সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদ ওবায়দুল কাদের; গণপূর্তমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন; বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
৭ উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, ৯টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
১৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন প্রধানমন্ত্রী (ছবি- ফোকাস বাংলা)শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও নয়টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উদ্বোধন করা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হলো— কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ, কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের একশ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রী নিবাস, কক্সবাজার সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবন কাম এক্সামিনেশন হল, কক্সবাজার সরকারি কলেজের একশ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রী নিবাস, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব মহিলা কলেজ, কক্সবাজারের উখিয়ার দ্বিতল একাডেমিক ভবন ও মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন।
আর যে নয়টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, সেগুলো হলো— কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়) এলজিইডি অংশের আওতায় কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলাধীন বাকখালী নদীর ওপর খুরুস্কুল ঘাটে ৫৯৫.০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে পিসি বক্সগার্ডার ব্রিজ, কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কক্সবাজার আইটি পার্ক, এক্সিলাটে এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক নির্মিতব্য মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, সামিট এলএনজি টার্মিনাল কো. (প্রা.) লি. কর্তৃক নির্মিতব্য কক্সবাজার মহেশখালীতে দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় এসপিএম (ইনস্টলেশন অব সিংগেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্প, নাফ ট্যুরিজম পার্ক, কুতুবদিয়া কলেজের একাডেমিক ভবন এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস ভবন।

আরও পড়ুন-

সাগরপাড়ে হেঁটে বেড়ালেন প্রধানমন্ত্রী

‘বিএনপি দুর্দিনেও নাই, উন্নয়নেও নাই’

বিমান চালালেন তাসমিন, চড়লেন প্রধানমন্ত্রী

কক্সবাজার হবে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী: প্রধানমন্ত্রী

বিএনপি পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়: শেখ হাসিনা

কক্সবাজারকে সুন্দর করার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন আমার বাবা: প্রধানমন্ত্রী

/ইউআই/টিআর/