শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা : একটি ‘সরল স্বীকারোক্তি’

বিজয় রায় খোকাসেদিন শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখ লাখ মানুষ সারিবদ্ধভাবে বসে বয়ান শুনছিলেন। অপেক্ষা ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের। আমরা সংবাদকর্মীর কেউ ছবি তুলছি, কেউ দূর থেকে আসা মুসল্লিদের সাক্ষাৎকার নেওয়ায় ব্যস্ত। সকাল ৯টার দিকে আমরা কয়েকজন সংবাদকর্মী ঈদগাহ মিম্বরের দ্বিতীয় তলায় উঠি (বলে রাখা ভালো দ্বিতীয় তলার জায়গাটি শুধু প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, ভিআইপি ও সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত)। ওপরে উঠে আমরা জেলা প্রশাসকসহ অনেকের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলাম। আর মাঠে চলছিল একসঙ্গে অনেক মাইকে বয়ান।
নামাজের ইমামতি করার কথা ছিল মাওলানা ফরিদ ঊদ্দীন মাসউদের। ঈমাম সাহেবের হেলিকপ্টারটি দেখলাম মাঠে মুসল্লিদের মাথার ওপর দিয়ে একটি চক্কর দিয়েই চলে গেলো। ঠিক তখনই (সকাল ৯টা দশ মিনিট) আমার পাশে দাঁড়ানো নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ সদস্যের ওয়্যারলেসে একটি বিকট শব্দ শুনতে পাই। কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা চাপা তৎপরতা শুরু হয় পুলিশের। এদিকে মাইকে উচ্চ শব্দে বয়ান চলছে।
একজন পরিচিত পুলিশ সদস্যের কাছে জানতে চাইলাম ভাই ঘটনা কী? তিনি আমাকে বললেন, ‘জঙ্গিরা হামলা করেছে পুলিশের ওপর।’ মাঠে জমায়েত মুসল্লিরা দূরের কথা, আমার আশপাশে থাকা অনেকেই জানে না ৫০০ মিটার দূরে কী ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হচ্ছে! আমি আমার পাশে থাকা কয়েকজন সহকর্মীকে জানালাম ভয়াবহ কিছু একটা ঘটছে। আরও কিছু তথ্য পেলাম, ঘটনাটি সত্যি ভয়াবহ। তখন একদিকে নামাজের জন্য প্রস্তুত তিন লাখ মুসল্লি, অন্যদিকে চলছে পুলিশের সঙ্গে জঙ্গিদের গোলাগুলি। এত কাছে ঘটনা ঘটলেও অনেকগুলো মাইক একসঙ্গে চলায় মাঠে জমায়েত হওয়া লোকেরা তখনও কিছুই আঁচ করতে পারেননি।
শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় পুলিশের অ্যাকশনআমরা টেলিভিশনসহ অনলাইন পত্রিকায় যারা তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচার করে থাকি তারা মিলিত হয়ে বসলাম এবং সার্বিক দিক বিবেচনা করে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিলাম টিভি স্ক্রলে অথবা কোনও সংবাদ মাধ্যমে নামাজ শেষ হওয়ার আগে আমরা সংবাদটি জানাব না। এমনকি আমরা কোনও সাংবাদিক নিজেদের সংবাদমাধ্যমের অফিসে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করব না।
এই সিদ্ধান্ত নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর কোনও চাপ বা অনুরোধ ছিল না। সিদ্ধান্তটি আমরা নিয়েছিলাম মুসল্লিদের নিরাপত্তার জন্য। এখানে আমরা সব সময়ের মতো কে কার আগে সংবাদ জানাব, সেই প্রতিযোগিতায় নামিনি। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ঈদগাহের সীমানায় যে তিন লাখ লোক নামাজের জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের কানে সংবাদটি পৌঁছালে হয়তো আতঙ্কে হাজার হাজার মানুষ পদদলিত হয়ে মারা যেতে পারেন। বিবেকের তাড়নায় আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার কাছে অন্তত তখন তাই মনে হয়েছে। এ মুহূর্তে দেশবাসীর কাছে খবরটি পৌঁছে দেওয়ার আগে মানুষের জীবন যেন বিপন্ন না হয়, সেটাই করা উচিত।
তাই আমরা ঘটনা ঘটার সময় থেকে অন্তত ১ ঘণ্টা খবরটি চেপে রেখেছিলাম। আমরা প্রতিনিধিরা না জানানোর পরেও কোনও না-কোনোভাবে আমাদের গণমাধ্যমের অফিসে হয়তো কিছু খবর আগে থেকেই পৌঁছে গিয়েছিল। যে কারণে অফিস থেকে ফোনে খবর জানতে চাইলেও তখন আমরা গড়িমসি করেছি। সব ঘটনা জানার পরও না জানার ভান করে কাটিয়েছি ১ ঘণ্টা। আমরা মাঠে কয়েকজন সহকর্মীকে রেখে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহে ছুটে গেছি। মুসল্লিরা নামাজ আদায় করে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা গণমাধ্যমে তা প্রচার করি।
শোলাকিয়া হামলার পরের ঘটনা দেশবাসীর কাছে আর অজানা নেই। সংবাদ জানার পরও ঘটনাটি ১ ঘণ্টা চেপে রেখে হয়তো পেশাগত কাজে অবহেলা করেছি, এমন কথা উঠতেই পারে, তারপরও মানুষের জীবন বাঁচাতে পেশাগত কাজে এমন অবহেলা আমি বারবার করব।