ঠাকুরগাঁওয়ে গম সংগ্রহে অনিয়ম

গম (ছবি-অনলাইন থেকে সংগৃহীত)ঠাকুরগাঁওয়ে সরকারের গম সংগ্রহ অভিযানের নামে চলছে অনিয়মের উৎসব। গত বছর এই লুটপাট কিছুটা নিরবে সম্পন্ন করা গেলেও এবার চাষিদের একাংশ টের পেয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন মহলের নেতৃত্বে গম সংগ্রহ অভিযানের নামে চাষিদের ১৮ কোটি টাকা লুটপাটে এবার খাদ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগের সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যোগসূত্রের অভিযোগও পাওয়া গেছে। চাষিদের অ্যাকাউন্ট পে-চেকের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হলেও যে ব্যক্তির নামে টাকা তোলা হয় তিনি  বিষয়টি জানেন না।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্য গুদামে কখনোই তারা গম সরবরাহ করতে পারেন না। এ বিষয়ে মাইকিং করার কথা থাকলেও মাইকিং করা হয় না। এতে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হয় না।  সরকারের ভর্তুকির টাকা হরিলুট হয় এমন অভিযোগ কৃষকদের।

জানা গেছে, এ জেলায় সরকার শুধু গমের মূল্য পরিশোধ করতেই ব্যয় করছে প্রায় ৫২ কোটি টাকা।

জেলা খাদ্য বিভাগ জানায়, সারাদেশে সরকারের গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ মেট্রিক টন। এরমধ্যে সর্বোচ্চ গম উৎপাদনকারি ঠাকুরগাঁও জেলা বরাদ্দ পায় ১৭ হাজার ৯শ মেট্রিক টন। বর্তমানে গমের বাজারদর ১৮ টাকা কেজি হলেও প্রতি কেজিতে কৃষকদের জন্য সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে ১০ টাকা। এতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ কোটি টাকা। এই টাকা কৃষকের হাতে পৌঁছাতে সরকার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করলেও এসব নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী ও মধ্যসত্ত্বভোগীরা। ফলে নিয়মের ফাঁক গড়িয়ে সরকারের এসব ভর্তুকির টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। গম সংগ্রহ অভিযানে কৃষকদের তালিকা হলেও তা জানতেও পারেন না তারা। সংশ্লিষ্ট বিভাগে গুদামে গম দেওয়ার স্লিপ খুঁজতে গেলে স্লিপ না নিয়েই ফিরতে হয়, এমন অভিযোগ কৃষকদের।

এছাড়া অসময়ে গম সংগ্রহ অভিযানে ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষকরা বলেন, ‘এখন শতকরা ৯০ ভাগ কৃষকের ঘর গম শূন্য। মধ্যসত্ত্বভোগীরা স্থানীয় বাজার থেকে গম কিনে সরকারি গোডাউনে সরবরাহ করছে। এমনকি কৃষকের চোখ ফাঁকি দিতে রাতের আঁধারেও গম কেনা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।  এ অবস্থা ঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলায়। প্রতিটি উপজেলায় কৃষকের নামের গম বরাদ্দের স্লিপ সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা সংগ্রহ করে এখন গ্রামে গ্রামে কৃষকের কৃষি কার্ড সংগ্রহ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, চেক সংগ্রহ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার দুওসুও ইউনিয়নের লালাপুর গ্রামের কৃষক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কৃষি কার্ড আছে। কিন্তু আমরা কখনও সরকারের কাছে গম ও ধান বিক্রি করতে পারিনি।’

ওই গ্রামের আমিরুল ইসলামও একই অভিযোগ করে বলেন, ‘কৃষককে ন্যয্য দাম দিতে সরকার গমে ভর্তুকি দিচ্ছে কিন্তু সেই টাকা কখনও কৃষকের হাতে পৌঁছে না। লুটপাট হয় টাকা। এজন্য সরকার যদি গম উত্তোলনের সময় সংগ্রহ অভিযান শুরু করে। কৃষকদের নাম নির্বাচিত করে আগেই তা প্রকাশ করে তবেই কৃষকরা এ সুবিধা পাবে।’

বেউরঝাড়ি গ্রামের সুধীর চন্দ্র পাল বলেন, ‘গম বিক্রি করে বোরো ধানের আবাদ করেছি। সেই ধান এখন কাটছি। এই সময় যদি গম কেনা হয়  তবে কৃষক কিভাবে দেবে?’

এসব বিষয়ে স্থানীয় খাদ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। তবে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশ্রাফুজ্জামান বলেন, ‘চলতি সংগ্রহ অভিযানে ঠাকুরগাঁও সদর, পীরগঞ্জ, বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রানীশংকৈল উপজেলায় থেকে মাত্র চার হাজার মেট্রিকটন গম সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ সংগ্রহ অভিযান শেষ হবে আগামী ৩০ জুন।

তবে জেলা প্রশাসক ও খাদ্য সংগ্রহ কমিটির সভাপতি আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘কৃষি বিভাগের তালিকা অনুয়ায়ী প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে গম নেওয়া হবে।’

/বিএল/এসএমএ/