অর্থ লোপাটের আশঙ্কায় বরাদ্দ ফেরত দিলেন সিভিল সার্জন!

সিভিল সার্জনের কার্যালয়, চাঁদপুর

অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের আশঙ্কায় বরাদ্দের এক কোটি টাকা ফিরিয়ে দিলেন চাঁদপুরের সিভিল সার্জন। সরঞ্জাম কেনার আলাদা আলাদা নির্দেশনা, সময় স্বল্পতা এবং অর্থ লোপাটের আশঙ্কায় তিনি ওই বরাদ্দ গ্রহণ করেননি।  তাছাড়া এত বিপুল অর্থের জিনিসপত্র কেনার জন্য কোনও বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে ‘বিশেষ’ এ বরাদ্দ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনার কথা ছিল।

সিভিল সার্জন ডা. মতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বরাদ্দের অর্ডার হয়েছে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ঠিকাদার গত ৯ মে আমাকে তা দেখায়। এ অবস্থায় আমি ডিজি অফিসে চিঠি দেই। ২৮ মে ডিজির চিঠি পাওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করি। বৈঠকে এত অল্প সময়ের মধ্যে কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে তা ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুরের সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইফুর রহমান ২২ নম্বর স্মারকে এ বছরের ২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর বরাদ্দের জন্য আবেদন করেন। আবেদনে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ৫০ লাখ টাকা, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ২০ লাখ টাকা, গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা বাবদ ২০ লাখ টাকা, লিলেন সামগ্রী বাবদ ২০ লাখ টাকা এবং আসবাবপত্র বাবদ ৪০ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার জন্য বিশেষ কিস্তির অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়। এসব উপকরণ তিনটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল (কচুয়া, মতলব দক্ষিণ ও হাজীগঞ্জ), ৪টি  ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল (শাহরাস্তি, হাইমচর, ফরিদগঞ্জ ও মতলব) এবং ২০টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিতরণের জন্য চাওয়া হয়।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মতিউর রহমান

আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (বাজেট) ডা. মো. আনিছুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে সিভিল সার্জন চাঁদপুরের নিয়ন্ত্রণাধীন উপজেলা হাসপাতালগুলোর জন্য ৪৮৬৮ এমএসআর খাতে অতিরিক্ত (এক কোটি) টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। সময়ক্ষেপণের কারণে গত ১৫ মে ওই বিশেষ বরাদ্দের টাকা ব্যয়ের কোনও সুনির্দিষ্ট গ্রুপওয়ারি বিভাজন দেওয়া নেই বলে টাকা ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না মর্মে মহাপরিচালক বরাবর চিঠি পাঠান বর্তমান সিভিল সার্জন মতিউর রহমান।

এ সিদ্ধান্তের কারণে স্বাস্থ্য বিভাগের বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের হাত থেক্ষে রক্ষা পেল বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএমএ চাঁদপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুন্নবী মাসুম বলেন, ‘এই বরাদ্দের বিষয়টি আমরাও জানতাম না। এক রকম লুকোচুরির মধ্যেই এ বরাদ্দটি জায়েজ করার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু শেষ সময়ে সিভিল সার্জনের সিদ্ধান্তে তা বুমেরাং হয়ে গেছে।’

এদিকে একটি সূত্র জানায়, বরাদ্দটি যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে এনেছিল, ইতিমধ্যে তাদের মোটা অংকের ঘুষসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়ে গেছে। ফলে তারা দিশেহারা।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, কোনও নিয়মনীতি অনুসরণ করে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তাছাড়া যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিশেষ বরাদ্দের নামে বরাদ্দটি আনে, তারা সরঞ্জামাদি ক্রয় করার কাগজটি দু’ মাস তাদের পকেটেই রেখে দেয়। শেষ মুহূর্তে এসে ওই চিঠি বের করে দেয়। ফলে এই সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ওষুধপত্রসহ এসব সরঞ্জামাদি কেনা সম্ভব না।

যাচাই-বাছাই ছাড়া ক্রয় করলে সেখানে অনিয়মের আশঙ্কা থাকতো এবং সরকারের অর্থ আত্মসাৎ হওয়ার শঙ্কা ছিল। এসব ব্যাপারে সিভিল সার্জন স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন এবং চিঠিও দিয়েছেন।

সিভিল সার্জন মতিউর রহমান জানান, ডিজি অফিসের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে যদি এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না হয় তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা (টাকা) সমর্পণ করবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবে দেখেছি, এ সময়ের মধ্যে কাজ সঠিকভাবে হবে না। সরকারের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই টাকা ফেরত পাঠিয়েছি।’

এদিকে, এই সরঞ্জামাদি ক্রয়ের অন্যতম ঠিকাদার (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) আলমগীর ভূঁইয়া বলেন, ইচ্ছা করলে সিভিল সার্জন মালামালগুলো ক্রয় করতে পারতেন। তিনি ইচ্ছে করেই বিশেষ বরাদ্দটি ফেরত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমাদের কোনও কথা নেই। তবে মালামাল ক্রয় না করার কারণে এ অর্থ বছরে বিপুল পরিমাণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

/বিএল/টিএন/