দেশের ২২ স্থলবন্দরের মধ্যে বর্তমানে ১১টি চালু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বেনাপোল স্থলবন্দর। কিন্তু এ বন্দরে আধুনিক কোনও সুযোগ সুবিধা নেই। কাজ চলে পুরনো পদ্ধতিতে। রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বন্দরে মাত্র আড়াই ঘণ্টায় কলকাতা থেকে পণ্য আনা যায়। তবে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সব সময়ই বন্দরে লেগে আছে জট। ফলে আমদানিকারকরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বেনাপোল স্থলবন্দরে নেই আধুনিক অবকাঠামো। তাইতো অনেক দিন থেকেই বন্দর আধুনিকায়নের দাবি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রফতানি হয়। বন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বছরে প্রায় ১৩ লাখ পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত করে। এ থেকেও বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা হচ্ছে সরকারি কোষাগারে।
বেনাপোল বন্দরে আমদানি করা পণ্য রাখতে ৪০টি শেড রয়েছে। যার অধিকাংশেরই মেয়াদকাল অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ওপেন ইয়ার্ড পাঁচটি, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড একটি, ট্রাক টারমিনাল মোট তিনটি। এসব গুদামে ধারণক্ষমতার প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু সব সময়ই বন্দরে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন পণ্য মজুদ থাকে। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ মালামাল ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়। এমনকি ট্রাক টারমিনালে রাখা হচ্ছে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানিতে গতি বাড়াতে ভারতের পেট্রাপোলে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক ইন্টিগ্রেটেড চেকপেস্ট। সেখানে এক হাজার থেকে দেড় হাজার ট্রাক রাখার ব্যবস্থা, পুরো বন্দর এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। রয়েছে উন্নতমানের সড়ক ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসি ওয়্যার হাউজ, চোরাচালান প্রতিরোধে স্কানিং ব্যবস্থাসহ আরও অনেক আধুনিক ব্যবস্থা। বেনাপোল বন্দরে একই ধরনের সুবিধা থাকার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা গড়ে তোলা হয়নি। ৪৫ বছরেও বন্দর কম্পিউটারাইজড করা হয়নি। এখনও হাতে লিখে কাজ সারেন বন্দরের কর্মকর্তারা। মালামাল পুড়ে গেলেও হিসেব পাওয়া যায় না ক্ষয়ক্ষতির।
বেনাপোল স্থলবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, জায়গা সংকটের কারণে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের মেশিনারিজ, গাড়ি ও কেমিক্যালসহ শত শত কোটি টাকার পণ্য। নষ্ট হচ্ছে পণ্যের গুণগত মান। বন্দরের শেডে জায়গা না থাকায় শেডের বাইরে রেললাইনের পাশের গর্তে পড়ে আছে ভারত থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের গাড়ি। বন্দর অভ্যন্তরে নতুন শেড নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তার উন্নয়নের কাজ চলছে খুবই ধীর গতিতে।
বন্দরে আমদানিকৃত মালামাল লোড-আনলোডের জন্য ভাড়া করা অধিকাংশ ক্রেন ও ফর্কলিফট নষ্ট থাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া। বন্দরে সিসি ক্যামেরা না থাকায় দেদারছে চুরি হচ্ছে পণ্য। চুরিতে বাধা দিতে গিয়ে সম্প্রতি এক আনসার সদস্য চোর চক্রের হাতে জীবন দিয়েছেন। এরপরও বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
বেনাপোল বন্দরে জনবল সংকটের কারণে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি শেডে দেখা যায় স্টোরকিপাররা এক-দুইজন করে বাইরের লোক রেখে দিয়েছেন কাজ এগুনোর জন্য। পণ্য চুরির এটিও একটি কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন আমদানিকারকরা। বন্দরের সামনে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের দোকানে। সেখানে বন্দরের আমদানিকৃত পণ্য কিনতে পাওয়া যায়।
এসব অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক ব্যবসায়ী এ বন্দর ছেড়ে চলে গেছেন।
সম্প্রতি বেনাপোল স্থলবন্দরে ৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে পুরাতন আধলা ইট, খোয়া এবং নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী।
এডিবির অর্থায়নে (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এ বন্দরের উন্নয়ন কাজ করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মনিকো লিমিটেড। দুই বছরের মধ্যে তাদের এই কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এসব উন্নয়ন কাজের মধ্যে রয়েছে, নতুন দুটি গুদাম, চারটি ওপেন শেড, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন, বন্দরের অভ্যন্তরের সড়ক ও ইয়ার্ড নির্মাণ।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানের কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু ৪৫ বছরের পুরনো ভবন ভেঙে সেখান থেকে ইট নিয়ে নতুন করে শেড তৈরি করলে তা যে কোনও সময় ধসে যেতে পারে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে তেমন কোনও সমস্যা হবে না।
ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী শত শত ট্রাক বন্দরে জায়গা না পেয়ে রাস্তার ওপর পার্কিং করা হয়। ফলে বেনাপোল প্রধান সড়কে সব সময় লেগে থাকে যানজট। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা পড়েন ভয়াবহ ভোগান্তি।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘প্রতিবছর এই বন্দর থেকে সরকার প্রায় চার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। কিন্তু এখানে অবকাঠামোর বেহাল দশা। এতে পণ্য খালাসে বিলম্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষতিতে ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে কিছু উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও সেখানে পুরনো আধলা ইট খোয়ার ব্যবহার দুঃখজনক।’
তিনি বলেন, ‘বেনাপোল স্থলবন্দর এদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। স্থলবন্দরটি অচলাবস্থার মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রতিদিন পণ্য বোঝাই অন্তত ৩৫০টি ট্রাক লোড-আনলোডের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে বন্দরটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এই বন্দরকে আরও গতিশীল করে তোলার জন্য প্রথমেই দূর করতে হবে জায়গার সংকট। এ কারণে পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যবোঝাই ট্রাকগুলোকে বেনাপোলে বন্দরে প্রবেশের জন্য ৮-১০ দিন অপেক্ষায় থাকতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বেনাপোল স্থলবন্দরকে বাণিজ্যের উপযোগী করে তুলতে এর ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নির্মাণ করতে হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। আনতে হবে অত্যাধুনিক ইক্যুইপমেন্ট।’ ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদামসহ ১৫টি শেড নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
বেনাপোল স্থলবন্দর উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) রেজাউল করিম বলেন, ‘বেনাপোল বন্দরে ১০০ কোটি টাকার কাজ শুরু হয়েছে। কাজ সম্পন্ন হলে বন্দরে নতুন দুটি শেড, ফ্লোর পাকাকরণ, ড্রেন নির্মাণসহ আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা থাকবে। সাময়িক কিছু সমস্যা আছে। কাজ শেষ হলে বন্দরে কোনও সমস্যা থাকবে না। বন্দরে পণ্যজটও কমে যাবে বলে আশা করছি।’
/এসটি/