‘বেবাক নদীতে চইল্যা গেল, কেউ দ্যাখবারও আইলো না’

মাছুয়াকান্দি এলাকার ৩নং ক্রসবার বাঁধের প্রায় ১শ’ মিটার সলিড ও মাটির অংশ আকস্মিক ধসে যমুনায় বিলীন হয় (ছবি-সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি)

‘এ্যাক র‌্যাইতের মদ্যেই (মধ্যে) বেবাক (সব) নদীতে চইল্যা গেল। আমার মাজা ভাঙা। গত রোজায় পইড়া যাইয়্যা মাজাডা ভাইঙা গেছে। ঘরের মদ্যেই শুইয়্যা থাকি। কাল রাইতও ঘরে শুইয়া ছিলাম। হঠাৎ চিক্কুরের (চিৎকার) শব্দ। আমারে পোলারা পাঁজাকোলা কইরা তুইলা বাঁদের (বাঁধ) ওপর থুইয়্যা গেল। আর কি গুম (ঘুম) হয়। আন্ধারের মদ্যি কিছু দেইখার না পারলেও হুনবার পাইলাম, খালি সোরসার (শোরগোল), আর চিল্লাপাল্লি। তারপর ভোর হইয়া গেল। তহনও লোকজনের শব্দ। হগ্গলেই (সবাই) যে যার মত যিনিসপত্র টানে তুইলা নিয়ে আসছিল। পরে হকাল (সকাল) দুপুর হইলো। কেউ আমাগোরে দ্যাখবারও আইলো না। বাবারে, আপনারা কারা? ছইবি তুলেন কেন?’ অস্ফুট স্বরে কথাগুলো বলেন ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বয়োবৃদ্ধ রওশন আরা (৭৫)।

সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাঁধের ওপর অন্যের ঝুপড়িতে ছেঁড়া ও ময়লা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকা রওশন আরা সাংবাদিকদের ছবি তোলা দেখে এসব কথা বলেন। তার সব কথা ভালোমতো বুঝতে অসুবিধা হলেও একটা কথা স্পষ্ট ছিল; আর তা হলো, কেউ দেখতে এলো না।

রবিবার (৯ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার পর পাউবোর ৩নং ক্রসবার বাঁধের প্রায় ১শ’ মিটার সলিড ও মাটির অংশ আকস্মিক ধসে যমুনায় বিলীন হয়। এতে রওশন আরাসহ ওই এলাকার ১০টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। সোমবার (১০ জুলাই) সংবাদ সংগ্রহের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গেলে রওশন আরা অভিযোগ করেন, কেউ দেখতেও এলো না।  

স্থানীয়রা জানান, কেবল রওশন আরার পরিবার ছাড়াও ওই এলাকার ১০টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। এতে আতঙ্কে আরও অন্তত শতাধিক পরিবার যে যার মতো নিজেদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নেয়।  রওশন আরার মতো একই অভিযোগ করেছেন আরও অনেকেই।

সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল গুছাচ্ছেন এক নারী (ছবি-সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি)

কাজিপুর সদর থেকে মাত্র ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ৩-৪ কি.মি. দূরে। তবুও সোমবার (১০ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত সেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা পাউবোর কোনও কর্মকর্তা যাননি বলে ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেন। তবে দুপুর ২টার পর জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার সিদ্দীকা ভাঙন কবলিত বাঁধের প্রায় ৭-৮ কি.মি. ভাটিতে শুভগাছা ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত চার শতাধিক মানুষের মাঝে ত্রাণ ও অর্থ সাহায্য দিতে যান।

বিকাল ৩টার দিকে এ প্রতিবেদক জেলা প্রশাসককে ভাঙনের খবর দিলে সোয়া ৪টার দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম মাছুয়াকান্দিতে যান। স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঠিক তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন এবং মঙ্গলবার সাহায্য করবেন বলে আশ্বাস দিয়ে চলে যান। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এলেও পাউবোর কোনও কর্মকর্তা সারা দিনেও ভাঙন কবলিত এলাকায় যাননি বলে জানান স্থানীয়রা।

বসতবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে একটি পরিবার (ছবি-সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি)

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসক চলে যাওয়ার পর এখানে এসে জানতে পারলাম, ১০-১২টি পরিবার নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। তাদের তালিকা তৈরি হলে ত্রাণ বা সাহায্য দেওয়া হবে। পাউবোর লোকজনও দুশ’ জিওব্যাগ বালির বস্তা এখানে ফেলবে।’

পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘গতাকাল সেখানে গিয়েছিলাম। যমুনার পশ্চিম পাড়ের অনেক স্থানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ জিওব্যাগের বস্তা ফেলেও এসব ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়নি।’

/এমএ/এফএস/