এর আগে, রবিবার (৩০ জুলাই) পুনঃময়নাতদন্ত রিপোর্টের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পরপরই দিয়াজের অনুসারীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। পরদিন সোমবার (৩১ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয় স্থগিত কমিটি সভাপতি আলমগীর টিপুর নেতৃত্বে পাল্টা শোডাউন করেছে অন্য পক্ষের নেতাকর্মীরা। যদিও ওই পক্ষের নেতাকর্মীরা দাবি করেছেন, বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নয়, ওই দিন তারা একত্রিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। সেখানে দিয়াজের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছেন বলে জানিয়েছেন এক নেতা।
দিয়াজ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের পাল্টাপাল্টি শোডাউন কর্মসূচিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনে। পাল্টাপাল্টি এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যেকোনও সময় ক্যাম্পাসে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারা এ বিষয়ে লেখালেখি করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে মনে হচ্ছে ক্যাম্পাসে হয়তো আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটবে।’
নিহত দিয়াজ ইরফানের অনুসারী বিশ্ববিদ্যালয় স্থগিত কমিটির সহ-সম্পাদক মোহাম্মদ মহসিন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা আগেও দাবি করেছি, এখনও বলছি— বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা দিয়াজ ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। তারাই প্রভাব খাটিয়ে প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালিয়েছে। কিন্তু তাদের সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পুনঃময়নাতদন্ত রিপোর্টে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উঠে এসেছে। এখন আমরা খুনীদের বিচার চাই।’
মহসিন ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা আমাদের নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি প্রকৃত খুনীদের শাস্তির আওতায় আনার কথা দিয়েছেন। দিয়াজ ভাই উনার পক্ষে রাজনীতি করতেন। অন্য কোনও নেতার অনুসারীরা যদি দিয়াজ ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চান, তাহলে উনারা ভুল করছেন। কাউকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে দেওয়া হবে না।’
দিয়াজ হত্যার পর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আলমগীর টিপু আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দিয়াজের মৃত্যুকে আত্মহত্যা দাবি করা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে পাঠ করা লিখিত বক্তব্যে ফজলে রাব্বি সুজনেরও স্বাক্ষর ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলনের ওই লিখিত বক্তব্যে আমি সই করিনি। আলমগীর টিপু জানিয়েছিল, তারা সংবাদ সম্মেলন করবে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কোনও মতামত ছিল না। তারা ফটোশপে অন্য একটা পেপার থেকে আমার সই কপি করে বসিয়ে দিয়েছে। বিষয়টি আমি জানতাম না।’
এসব বিষয়ে ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সভাপতি আলমগীর টিপু বলেন, ‘দিয়াজ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। আমরা একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও চাই তার প্রকৃত খুনীদের চেহারা উন্মোচিত হোক। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কেউ যেন অপরাজনীতি করার সুযোগ না পায়। কেউ এ ধরনের চেষ্টা করলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
খুনের মামলায় তাকে আসামি করা ও বিরোধী পক্ষের অভিযোগের বিষয়ে টিপু বলেন, ‘দিয়াজকে খুনীদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি। আইনশৃংখলা বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে প্রকৃত আসামিদের নাম উঠে আসবে। তার আগে কেউ কাউকে দোষারোপ করা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া কিছু না।’
সোমবার চবি ক্যাম্পাসে শোডাউন করার বিষয়ে টিপু বলেন, ‘অনেকদিন পর ক্যাম্পাসে গিয়েছি। তাই সবাইকে নিয়ে উপাচার্য স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমরা কোনও শোডাউন করিনি।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ২০ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার নিজ বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে তার প্রথম ময়নাতদন্ত হয়। ২৩ নভেম্বর পুলিশ জানায়, দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে এমন আলামত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। পরে বিষয়টিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী ছাত্রলীগ নেতা, চবি সহকারী প্রক্টরসহ ১০ জনকে আসামি করে ২৪ নভেম্বর আদালতে মামলা দায়ের করে পুনঃময়নাতদন্তের আবেদন করে। পরে আদালতের নির্দেশে গত ১০ ডিসেম্বর কবর থেকে লাশ তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্তের পর লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানান চিকিৎসকরা। রবিবার (৩০ জুলাই) পুনঃময়নাতদন্ত রিপোর্টে দিয়াজের মৃত্যুকে ‘শ্বাসরোধজনিত হত্যামূলক’ বলে উল্লেখ করা হয়।
আরও পড়ুন-
চট্টগ্রামে নকল সন্দেহে জব্দ করা ডিমগুলো পরীক্ষার নির্দেশ
‘মিথ্যা’ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট দেওয়া চিকিৎসকদের শাস্তি চান দিয়াজের বোন
/টিআর/