নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেওয়া সামারুখ খাতুন রয়েছেন বড় ছেলে হাবিব উল্লাহর তত্ত্বাবধানে। চলাফেরা করতে পারেন না ঠিকমতো। কখনও বাংলাদেশে আসেননি। কিন্তু মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে শত বছরের ভিটে ছেড়ে কেন তাকে বাংলাদেশে আসতে হলো? এ প্রশ্ন সামারুখ খাতুনের।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সামারুখ খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার চৌদ্দ পুরুষ রাখাইন রাজ্যে বসবাস করে আসছেন। ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছি ঢেঁকিবনিয়ার ফকিরা পাড়ায়। কিন্তু এবারের মতো ভয়াবহ বর্বর নির্যাতন আর কখনো দেখিনি। শুনেছি, আমার অনেক আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী। মারধর করা হয়েছে তাদের। যে যেদিকে পারে আশ্রয় নিয়েছে। আমার তিন মেয়ে ও মেয়ের স্বামীরা কে কোথায় জানি না। আমার বড় ছেলেই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আর কয়দিন বাঁচবো। আমাকে কেন এখানে নিয়ে আসলো?’ প্রশ্ন করেন সামারুখ।
বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় অনেকে পালিয়ে তার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করে সামারুখ খাতুন। বলেন, ‘আমার বাড়ি বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় সে সময়ে অনেকেই আমার আশ্রয়ে ছিলেন। তাদের অনেককেই আমি নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছি। ঘুমানোর জায়গা করে দিয়েছি। আজ কি নির্মম পরিহাস। শেষ বয়সে আমাকেই তাদের কাছে আসতে হলো।’
সামারুখ খাতুনের বড় ছেলে হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘আমার মায়ের বয়স বেশি হলেও শরীর মোটামুটি ভাল ছিল। কিন্তু এখানে আসার পর দিন দিন অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন। মা মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার পর শারীরিক সমক্ষমতা হারাচ্ছেন। ঠিকমতো ঘুমাতে না পারার কারণে হয়তো স্বাস্থ্য খারাপের দিকে যাচ্ছে।’
মাকে এত দূরে কিভাবে নিয়ে আসলেন, জানতে চাইলে হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘এই জিরো পয়েন্ট থেকে ঢেঁকিবনিয়ার দুরুত্ব আনুমানিক ৩০ কিলোমিটার। এই ৩০ কিলোমিটার পথ মাকে কোলে নিয়ে পাড়ি দিয়েছি। কারণ শেষ বয়সে মাকে অমুসলিমদের হাত থেকে রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।’ কথাগুলো বলেই কেঁদে ফেলেন তিনি।’
গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় ওই দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্যসহ অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হন। এ ঘটনায় প্রতিদিন পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। নাফ নদীর জলসীমানা থেকে শুরু করে স্থল সীমানা পার হয়ে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইনে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু, এর কোনও তোয়াক্কা না করে আরকানে ফের সেনা মোতায়েন করলে বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে দেশের সেনাবাহিনী ও পুলিশ।