সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী ঢালার মুখ, তাজনিরমারছড়া, শফিউল্লাহ কাটা, হাকিমপাড়া, টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবনিয়া, রইক্ষ্যং ও নাইক্ষ্যংছড়ি বাঁশবাগান এলাকায় বনাঞ্চল সাবাড় করে গত কয়েকদিনে আসা রোহিঙ্গারা বস্তি গড়ে তুলছে। এসব এলাকায় পাহাড়ি ভূমি দখল করে অন্তত এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাস শুরু করেছে। তারা পাহাড় কেটে, বনজঙ্গল উজাড় করে বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি করছে নতুন ঘরবাড়ি। নতুন বস্তি হওয়ার খবর পেয়ে এসব এলাকার দিকে ছুটে যাচ্ছে অনুপ্রবেশকারী হাজারও রোহিঙ্গা। এসব এলাকার পথে পথে এখন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের দীর্ঘ সারি। এদের কারও হাতে বস্তা, কুড়াল আবার কারও হাতে পলিথিন ও বাঁশ। অধিকাংশ নারীর কোলেই রয়েছে শিশু।
আগে থেকেই উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, টেকনাফের নয়াপাড়া, লেদা ও শামলাপুর এলাকায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বনবিভাগের জমির ওপর বসবাস করে আসছে।
টেকনাফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পুটিবনিয়া বন বিভাগের জমিতে পাহাড় কেটে সমতল করে মাটিতে বাঁশ পোঁতার কাজ করছিলেন মিয়ানমারের মংডুর কাচারবিল গ্রাম থেকে আসা ফরিদ মিয়া (৪৫)। তার সঙ্গে পাশেই মাটি সমতল করার কাজ করছিলেন তার পরিবারের আরও চার সদস্য। ফরিদ মিয়া জানান, তিনি পাশের এক চাকমার কাছ থেকে টাকা দিয়ে পলিথিন ও বাঁশ কিনেছেন। ওই বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে যে ঘর তৈরি হবে তাতে তার পরিবারের ১৩ সদস্য রাত কাটাতে পারবে। এখানে প্রতিটি ঘর তৈরি হচ্ছে ৮ ফুট বাই ১০ ফুট আয়তনের। জমি দখলে রাখা স্থানীয়রা এমন ঘর তৈরির নির্দেশনা দিয়েছে বলে জানান ফরিদ মিয়া। থাকার অনুমতির জন্য জমির এসব কথিত মালিককে দিতে হয়েছে দুই হাজার টাকা করে।
পাহাড়ের চূড়া সমতল করে ঘর বানাচ্ছিলেন মিয়ানমারের মংডুর খেয়ামং গ্রাম থেকে আসা মো. রফিক (৪০) ও তার পরিবারের সদস্যরা। রফিক জানান, তিনি পরিবারের ১১ সদস্যকে নিয়ে পাঁচদিন আগে টেকনাফের ঝিমংখালী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন। এরপর উখিয়ার বালুখালী অনিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরে ছিলেন চারদিন।
টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জালাল আহমদ বলেন, ‘সীমান্ত পেরিয়ে গ্রামগুলোতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঢুকছে। প্রতিদিন অসংখ্য নারী, পুরুষ ও শিশু এলাকার স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছে। যেদিকে তাকাই সেখানেই রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গাদের জন্য ইউনিয়নের পুটিবনিয়া ও রইক্ষ্যং এলাকায় নতুন করে গড়ে উঠেছে বস্তি।’
রোহিঙ্গাদের নতুন করে বস্তি গড়ে তোলা প্রসঙ্গে কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘আর কোথাও নতুন করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প হতে দেওয়া হবে না। গত এক সপ্তাহ ধরে উখিয়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের কুতুপুালং ও বালুখালী ক্যাম্প এলাকায় নিয়ে আসা হবে।’ টেকনাফ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় চাকমা বলেন,‘পুটিবনিয়া বনভূমিতে নতুন করে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। এখনও এ বিষয়ে দাফতরিকভাবে কোনও কিছু বলা সম্ভব নয়।’
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আলী কবির বলেন, ‘এবার রোহিঙ্গাদের তৎপরতা একটু বেশি। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের নামে নতুন করে বস্তি তৈরির চেষ্টা করছে। আমরা অভিযান চালিয়ে দুয়েকটি বস্তি উচ্ছেদও করেছি। এসব এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলমান রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪শ একর বনভূমি রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। এছাড়াও পুরনো ক্যাম্পগুলোর দখলে রয়েছে ৬শ একর বনভূমি। এসব বনভূমি থেকে দখল উচ্ছেদ করতে না করতে নতুন করে রোহিঙ্গাদের ঢল পুরো প্রশাসনকে ভাবিয়ে তুলেছে।’
গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ও সেনা পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। এতে ১২ পুলিশ সদস্য ও বহু রোহিঙ্গা হতাহত হয়। এর জেরে রাজ্যে অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগসহ কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এ কারণে প্রতিদিন পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবর থেকে টানা দমন-পীড়ন চালায় সেনাবাহিনী। ওইসময় প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। তারা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বস্তি গড়ে তোলে বসবাস করছে।