বঙ্গোপসাগরসহ বরগুনার স্থানীয় নদীতে জেলেদের পালে এখন হাওয়া লেগেছে। এক সপ্তাহ ধরে তাদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। তাই স্বরূপ ফিরেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র (বিএফডিসি) পাথরঘাটা। জেলে, আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। কেউ ইলিশ মাছের ঝুড়ি টানছেন, কেউ প্যাকেট করছেন, আবার কেউ কেউ সেই প্যাকেট দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে তুলে দিচ্ছেন ট্রাকে।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ অবতরণ কেন্দ্রে এক হাজার ৫শ’ ৬২ মেট্রিক টন মাছ আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন হাজার ৪শ’ ৫৪ মেট্রিক টন মাছ আসে। এদিকে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৪৮ মেট্রিক টন মাছ এসেছে, যা পুরো অর্থবছর শেষ হলে বিগত বছরগুলোর রেকর্ড ভাঙবে। একইসঙ্গে বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়।
এদিকে, ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ায় উপকূলীয় জেলে পল্লীগুলোতে স্বস্তি ফিরেছে। মাছ ভর্তি যান্ত্রিক নৌযান কিংবা মাছধরার (ফিশিং) ট্রলার নিয়ে জেলেরা গভীর সমুদ্র থেকে ফিরছেন মুখে হাসি নিয়ে। আবার অনেকে মাছ ধরার জন্য ছুটছেন সাগর পানে। তবে জলদস্যু আতঙ্কে অস্বস্তিও কম নেই জেলে পরিবারে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি বেশ কিছু ট্রলারে জলদস্যুরা হামলা করেছে। এতে জেলেদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে তাদের নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পাহারায় রয়েছে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড। মাছুম নামের এক জেলে জানান, মাস দুয়েক ধরে সাগরে জলদস্যুদের আনাগোনা বেড়েছে। এরই মধ্যে বেশকিছু ট্রলারে হামলাও হয়েছে।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সাগর থেকে ফিরে আসা ইলিশভর্তি ট্রলার ঘাটে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে আছে। ঘাট শ্রমিকরা কেউ বসে নেই। কেউ ট্রলার থেকে ইলিশ মাছের ঝুড়ি টানছেন, কেউ প্যাকেট করছেন, কেউ প্যাকেট ট্রাকে তুলছেন।
বরগুনার নলীবাজারের এফবি সোহেল ট্রলারের শ্রমিক মো. কবির হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রলার সকালেই ঘাটে নোঙর করেছি। সব সময় এরকম মাছ জালে ধরা পড়ে না। তবে এবারে যে মাছ পেয়েছি, তাতে খুশি। এবার আট থেকে ১০ লাখ টাকার মতো মাছ বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি।’
এফবি শাহরিয়ার ট্রলারের জেলে মো. মামুন বলেন, ‘গভীর সাগরে যারা যেতে পারছে তারা বেশি ও বড় মাছ ধরতে পারছে। যাদের ছোট ট্রলার, তারা গভীর সাগরে যায় না। তবে এবার আমাদের জালে যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েছে তা বিক্রয় করলে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আসবে।’
ট্রলার মাঝি মো. জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এবার ইলিশ মাছ বেশি ধরা পড়ছে। কয়েক দিন আগেও ইলিশ পাচ্ছিলেন না জেলেরা। তবে এখন আবার জালে ইলিশ ধরা পড়ছে।’
জেলেরা জানান, চলতি বছর ইলিশ মৌসুমের শুরুতে কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মেলেনি। তবে গত আগস্ট মাস থেকে গভীর সমুদ্রে জেলেদের জালে ধরা পড়তে শুরু করে ইলিশ। বৃহস্পতিবার ( ১৪ সেপ্টেম্বর) সাইজ অনুযায়ী মণ প্রতি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১৪ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ঘাটের শ্রমিক প্রশান্ত জানান, এক মাস আগেও তেমন ইলিশ ছিল না। হঠাৎ করে গত ১০ দিন ধরে জেলেরা ইলিশ মাছ নিয়ে পাথরঘাটায় আসছেন। ইলিশ ধরা পড়লে তাদের কাজও বেড়ে যায়। আর কাজ বাড়লে আয়ও বেড়ে যায়। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা করে আয় করছেন তিনি।
এফবি নূর মোহাম্মদ ও ভাই ভাই ট্রলারের মালিক মো. সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ইলিশ বেশি ধরা পড়ে। তবে ডিম পেটে আসলে ইলিশ গভীর সমুদ্রে থাকে। ডিম পরিপক্ক হলে ইলিশ সাগরের তীরের দিকে আসতে থাকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইলিশ মাছ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আগস্টের মাঝামাঝি থেকে শুরু করলে ভালো হয়। কারণ, ওই সময় থেকে ইলিশ ডিম ছাড়া শুরু করে।’
আল্লাহর দান আড়তের মালিক মো. আলম হাওলাদার বলেন, ‘সাগর থেকে যে সব ট্রলার ঘাটে আসছে, তাদের প্রত্যেকেই কম-বেশি মাছ পাচ্ছে। বিক্রি করেও ভালোই লাভ করছে তারা। মৎস্য অধিদফতরের কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনায় আগের তুলনায় ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে।’ ইলিশের দাম মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
আবুল বাশার নামে এক পাইকার জানান, ঢাকা, যশোর, ঝিনাইদহ, রংপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ইলিশ মাছ পাঠান তিনি। পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আসা মাছ অনেক ভালো এবং এখান থেকে নানান জায়গায় মাছ পাঠানো সহজ। এ বছর পর্যাপ্ত ইলিশ ধরা পড়ায় সব এলাকার চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ চালান করতে পারছেন তিনি।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে আগস্টের প্রথম দিকের তুলনায় কম। মাঝখানে তো একদম কমে গিয়েছিল। এখন আবার একটু বেড়েছে। বৃষ্টি হলে আরও ধরা পড়বে।’
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক লে. মো. নুরুল আলম জানান, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশসহ অন্যান্য মাছ বেশি ধরা পড়ছে। বর্ষা মৌসুমে বিএফডিসিতে ইলিশ মাছ অনেক বেশি আসছে। এতে সরকারের রাজস্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের টহল বৃদ্ধি এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় এবার ঝাঁকে ঝাঁকে বড় বড় ইলিশ ধরা পড়ছে।