বরিশালের বিলাঞ্চল বলে খ্যাত উজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাতলা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার শিবপুর গ্রাম। এ গ্রামে এখন দারিদ্র আর ক্ষুধামুক্ত জীবন, সংসার ও সমৃদ্ধ। গ্রামের নারী-পুরুষরা রাত পোহালেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে জীবন ও জীবিকার টানে। অভাবকে বিদায় জানিয়ে প্রধানত: গ্রামের গৃহবধূদের শ্রমে এখন ওই গ্রামের প্রায় দুই’শ পরিবার এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।
এক সময়ের দরিদ্র অঞ্চল বলে খ্যাত শিবপুর গ্রামের গৃহবধূরা এখন নিজেদের সংসার সামলিয়ে মুরগি ও মাছের খামার এবং সবজি ক্ষেতের পরিচর্যা করে দিন কাটিয়ে থাকেন। এসব খামার ও আগাম সবজি বিক্রি করেই স্বাবলম্বী হয়েছেন শিবপুর গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। ওই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা এখন নামিদামী বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পীকার এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুসের উদ্যোগে সড়ক সংস্কার ও কার্পেটিংয়ের পাশাপাশি প্রত্যন্ত বিলাঞ্চলে রাস্তা নির্মান এবং ঘরে ঘরে বিদ্যুত সংযোগ পৌঁছানোর ফলেই ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে পুরো গ্রামবাসীর। প্রায় দুই হাজার ভোটারের শিবপুর গ্রামে সিংহভাগই হিন্দু পরিবারের বসবাস।
সাতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক আজাদ জানান তিনি নিজেও সমিতির মাধ্যমে গ্রামের শতাধিক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের আমলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও বিদ্যুত সংযোগ পৌঁছে যাওয়ায় শিবপুর গ্রামের প্রায় দুইশতাধিক পরিবার একসাথে তিনটি (মাছ, মুরগি ও সবজি) চাষ করার মাধ্যমে আজ স্বাবলম্বী। আর এ সাফল্যের জন্য প্রতিটি পরিবারের নারীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন।
কয়েক বছর আগেও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও দারিদ্রপীড়িত ওই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হতো নৌকা নিয়ে বিলে মাছ ধরে , শাপলা বিক্রি করে। অভাব অনটন ছিলো তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। বিদ্যুত ব্যবস্থা ছিলো স্বপ্নের রাজ্যে। ওই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি যোগেন সরকার (৮১) বলেন বছরের বারো মাসের মধ্যে ৮/৯ মাস বিল-অঞ্চল পানিতে ডুবে থাকে।
প্রায় পুরো বছর জুড়েই জীবিকার্জন ও যোগাযোগের জন্য নৌকাই প্রধান ভরসা। নৌকাযোগে বিলে মাছ ধরে ও শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করাই ছিলো তাদের গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের পেশা। বিলের মধ্যে রাস্তা নির্মানের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় গ্রামের নারী-পুরুষরা তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন মৎস্য চাষের জন্য মাছের ঘের, মুরগি পালনের জন্য খামার নির্মান করা হয়েছে। এছাড়া ঘেরের চারিপাশে সবজি চাষ করা হচ্ছে।
এভাবে একই জমিতে ঘের করে একসাথে মাছ ও মুরগি পালনের সাথে সাথে কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন গ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার। ওইসব পরিবারের নারীরা আয়ের পাশাপাশি এখন পুষ্টিরও জোগান দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন দারিদ্র কমছে, ঠিক তেমনিভাবে নারীরা সমাজে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন।
একসময়ের এ দরিদ্র্য অঞ্চলের প্রতিটি ঘরের ছেলে-মেয়েরা এখন বিভিন্ন নামকরা স্কুল, কলেজে পড়াশুনা করছেন। ওই গ্রামের নির্মল রায় জানান, তিনি স্থানীয় বিশারকান্দি বাজারে মুদি-মনোহরীর ব্যবসা করছেন। গত তিন বছর ধরে তিনি আড়াই বিঘা জমিতে মাছের ঘের নির্মান করে তার মধ্যে বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ করছেন। ঘেরের মাঝখানে নির্মান করেছেন মুরগির ফার্ম। তার ফার্মে এখন প্রায় দুইহাজার মুরগি রয়েছে। একইসাথে ঘেরের চারিপাশে তিনি সবজি চাষ করেছেন। তার সবজি ক্ষেতে এখন সিম, বরবটি, লাউ, করল্লা ও কুর্শি রয়েছে। ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে সবজি চাষ করে ইতোমধ্যে তিনি প্রায় দুই লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেছেন। নির্মলের অনুপস্থিতিতে সবকিছু দেখভাল করেন তার স্ত্রী।
নির্মল বলেন, কয়েকবছর আগেও অভাবের সংসারে আমাদের খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। বর্তমান জীবনে অভাব নেই। ঐ গ্রামের দিনমজুর শিবু বিশ্বাস জানান একসময় বিলে মাছ ধরে ও শাপলা বিক্রির সামান্য আয়ে তার সংসার চলছিলো না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার পর তিনবছর আগে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তিনি নিজের এক বিঘা জমিতে ঘের নির্মান করে মাছ চাষ শুরু করেন। একইসাথে ঘেরের চারিপাশে সবজি চাষ করা হয়। এক বছরের সবজি বিক্রির টাকায় তিনি ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করেছেন। পরবর্তী বছরের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি দুইবছর আগে ঘেরের মধ্যে মুরগির ফার্ম করেছেন।
শিবু বিশ্বাসের মতে, মাছ, মাংস ও সবজি সবই উৎপাদিত হচ্ছে তার ঘেরে। তা বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানো হচ্ছে। তার সন্তানেরা আজ স্কুলে পড়াশুনা করছে। আগে দুইবেলা আধপেটা খেয়ে তাদের জীবন চললেও এখন সেসব অতীত।
নির্মল রায় ও শিবু বিশ্বাস জানান, মাছের ঘেরের মাঝখানে মুরগির ফার্ম করায় মুরগির বিষ্টা ঘেরে পরে বাড়তি আর কোন খাবার দিতে হয়না। নির্মল ও শিবু বিশ্বাসই শুধু নন; ওই গ্রামের দুইশতাধিক পরিবার এভবে ঘেরে মাছ চাষ ও মুরগির ফার্ম করে এবং ঘেরের চারিপাশে সবজি চাষ করে এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।