আগামী শনিবার রাসলীলা। এ উৎসবকে ঘিরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মণিপুরি অধ্যুষিত মাধবপুর ও আদমপুরের ঘরে ঘরে বইছে খুশির আমেজ। ইতোমধ্যে গত কয়েকদিন ধরে চলা রাসনৃত্য ও রাখালনৃত্যের মহড়াও শেষ হয়েছে।
রাসলীলা মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ বছর মাধবপুর জোড়ামণ্ডপ ও আদমপুর সানাঠাকুর মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে ১৭৫তম রাস উৎসব। আয়োজন দুই জায়গাতে হলেও বার্তা একই: বিশ্বশান্তি, সম্প্রীতি ও মানবপ্রেম।
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৭৫তম রাসলীলা উৎসবকে ঘিরে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) সকাল ১০টায় মৌলভীবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনন্দ র্যালির মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন জেলা প্রশাসক তোফায়েল ইসলাম। পরে বিকালে কমলগঞ্জের মাধবপুর শিববাজারে উন্মুক্ত মঞ্চে হোলি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মূল অনুষ্ঠান ৪ নভেম্বর শনিবার হবে। ওইদিন মাধবপুর ও আদমপুরে বসবে বিরাট মেলা। সেজন্য এখন থেকেই নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ঐতিহ্যবাহী রাসলীলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই গোটা কমলগঞ্জ উৎসবমুখর হয়ে উঠে। বিভিন্ন শ্রেণি, জাতি, পেশার মানুষ সমবেত হন। তাদের পদচারণায় মাধবপুরের জোড়ামণ্ডপ ও আদমপুর সানাঠাকুর মণ্ডপ মিলনমেলায় রূপ নেয়।
মণিপুরের রাজা ভাগ্যচন্দ্র প্রথম মণিপুরে এই রাসলীলার প্রবর্তন করেন। তবে মণিপুরের বাইরে ১৮৪২ সালে কমলগঞ্জের মাধবপুর জোড়ামণ্ডপে শুরু হয় রাসলীলা; যা এরপর থেকে প্রতি বছর হয়ে আসছে। এটি বর্তমানে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। ‘রাস’ শব্দটা এসেছে শ্রীকৃষ্ণের ১২ ধরনের রস থেকে। তবে ১২টি রসের মধ্যে রাসলীলায় সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর -এই তিন রসের উপস্থাপন থাকে। রাস উৎসব সফল করতে প্রায় মাস খানেক ধরে পাড়ায় পাড়ায় রাসনৃত্য এবং রাখালনৃত্যের প্রশিক্ষণ ও মহড়া চলে।
মাধবপুরে তিনটি জোড়ামণ্ডপের আওতায় এই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পুরোহিতের পরামর্শে একজন প্রশিক্ষক ধর্মীয় বিধান অনুসারে গোপী বা শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষক শিল্পীদের ঠিক করেন। এরপর সামাজিক বিধান অনুযায়ী শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমন্ত্রণের বাইরেও কেউ চাইলে রাসনৃত্যে অংশ নিতে পারেন। এই গোপীদের বয়স ১৬ থেকে ২০ বা ২২ বছর হওয়া লাগে। শুধু রাধার বয়স হতে হয় ৫-৬ বছর। নৃত্যের প্রতিটি দলে ন্যূনতম ১২ জন অংশ নিয়ে থাকে। একইভাবে রাখালনৃত্যেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনটি অংশে চলে এই রাখালনৃত্য। প্রতিটি দলে ১৪-১৫ বছর বয়সী ২০-২২ জন বালক অংশ নিয়ে থাকে। এই পুরো বিষয়টি সমন্বয় করে মণিপুরি মহারাসলীলা সেবাসংঘ। মাধবপুরেই বড় অনুষ্ঠানটি হয়ে থাকে।
এ বছর মাধবপুরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. আজিজুর রহমান, পুলিশ সুপার শাহজালাল, কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সদস্য অধ্যাপক মো. রফিকুর রহমান, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এম. মোসাদ্দেক আহমেদ মানিক, মণিপুরি সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি প্রতাপ চন্দ্র সিংহ। এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মণিপুরি মহারাসলীলা সেবাসংঘের সভাপতি প্রকৌশলী যোগেশ্বর সিংহ। আয়োজকরা জানান, বেলা ১১টা থেকে ‘গোষ্ঠলীলা বা রাখালনৃত্য’ দিয়ে শুরু হবে মূল উপস্থাপনা।
গোষ্ঠলীলায় রাখাল সাজে কৃষ্ণের বালকবেলাকে তুলে ধরা হয়। গোধূলী পর্যন্ত চলে রাখালনৃত্য। রাত ১১টা থেকে পরিবেশিত হয় মধুর রসের নৃত্য বা শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলা অনুসরণ, যা চলে ভোর (ব্রাহ্ম মুহূর্ত) পর্যন্ত। এই রাসনৃত্যে গোপিনীদের সঙ্গে কৃষ্ণের মধুরলীলা গানে, সুরে ও কথায় প্রকাশ করা হয়।
মণিপুরি রাসলীলা সেবাসংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ বলেন, ‘বাংলাদেশে মণিপুরিদের এক গৌরবময় দিন রাসলীলা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আমরা তেমন ভাবছি না। কারণ, আমাদের এখানে উৎসব চলাকালে কোনও গণ্ডগোল বা অঘটন ঘটেনি।’ আয়োজক কমিটির সদস্যসচিব হেমন্ত কুমার সিংহ বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি ভালোই। নিরাপত্তা নিয়ে কোনও দুশ্চিন্তা নেই।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ও কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বদরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তার জন্য দুই জায়গাতেই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের তিন স্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।