ব্রিটিশ শাসনামলের ব্যস্ততম রেলওয়ে জংশন লালমনিরহাটে রেলকর্মীদের বিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজনে ১৯০৫ সালে গড়ে উঠেছিল এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট মঞ্চ। অবিভক্ত ভারতবর্ষে যে কয়টি ঘূর্ণায়মান মঞ্চ ছিল এটি ছিল তার অন্যতম।
এরই সুযোগ নিয়ে এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট ও এর চত্বর লিজের আবেদন করেই সেখানে এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণ কাজ শুরু করেছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
জানা গেছে, জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃপক্ষ ২০০৫ সালে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শহরের থানা রোডের অস্থায়ী জায়গায়। শিক্ষার্থীদের জায়গা না হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে এম টি হোসেন ইনস্টিটিউটের জায়গাটিতে চোখ রাখে তারা। সেখানেই স্কুলটি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গত ২ নভেম্বর রেল কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে ইনস্টিটিউটটির প্রাঙ্গনে স্কুলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু সংস্কৃতিকর্মী দাবি করেছেন, এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট এবং এর আশপাশের প্রায় তিন একর জমি দখলে নেওয়ার জন্য প্রথম চেষ্টা করেন স্থানীয় শাপলা টেইলার্সের মালিক মোকছেদুর রহমান। তিনি ২০১০ সালে নার্সারি করার জন্য লিজও নেন। পরবর্তীতে সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনের মুখে সেই লিজ বাতিল করা হলেও চেম্বার অব কমার্সের সদস্য হওয়ায় এবার সংগঠনটির নেতৃত্বে সেখানে স্কুল গড়ার পেছনে তিনিই নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন। চেম্বার অব কমার্সের দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। একই তথ্য মেলে রেলওয়ে ভূ-সম্পদ বিভাগে। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি রক্ষা না করে এর ভূসম্পত্তি আত্মসাৎ চেষ্টায় রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তাও মোকছেদুর রহমানের সঙ্গে ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায় সেখানে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোকছেদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনের কাছে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কিন্তু, এ বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠা এলসিসিআই স্কুলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গিরিন্দ্রনাথ বর্মণ জানান, ‘২০১০ সাল থেকে এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজটির পাঠদান থানা রোডের ক্যাম্পাসে হয়ে আসছে। এই ক্যাম্পাসে জায়গা সংকুলানের কারণে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে চলতি মাসের ২ নভেম্বর এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট চত্বরে স্কুলটির নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।’
লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি এ কে এম কামরুল হাসান বকুল বলেন, ‘শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে। থানা রোডে জায়গা সংকুলানের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে জমি লিজ নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা রেজুয়ানুল হক বলেন, ‘এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে কোনও প্রতিষ্ঠানকে এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট কিংবা ওই এলাকায় কাউকেই রেলওয়ের জমি লিজ প্রদান করা হয়নি। শুনেছি সেখানে এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন করার চেষ্টা হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম) নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘লালমনিরহাট এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট চত্বর এলাকায় এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে কোনও প্রতিষ্ঠানকে রেলওয়ের জমি লিজ দেওয়া হয়নি। কিংবা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। যদি এম টি হোসেন ইনস্টিটিউট চত্বর এলাকায় কেউ কোনও ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা নির্মাণ করে থাকে তাহলে তা অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, ইনস্টিটিউটটির ঐতিহ্য সংরক্ষণ না করে স্কুলের নামে সেটি দখলের পাঁয়তারায় ক্ষুব্ধ লালমনিরহাটের সুশীল সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী ও উন্নয়ন আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। এ বিষয়ে লালমনিরহাট উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের আহবায়ক সুপেন্দ্র নাথ দত্ত বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের আন্দোলনের অন্যতম একটি বিষয় হলো ঐতিহাসিক এম টি হোসেন ইনস্টিটিউটটিকে টাউন হলে রূপান্তরিত করে এর চত্বরে জিমনেশিয়াম, মুক্তমঞ্চ, শিশুপার্ক নির্মাণসহ এর ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, পাশাপাশি শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রে রূপান্তর করা। এখানে এলসিসিআই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো একটি বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের আগে ইনস্টিটিউটটির সংস্কার জরুরি। এ জন্য আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবো।’
এ প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে লালমনিরহাট সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মজিবর রহমান বলেন, ‘নার্সারি করার জন্য মোকছেদুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে এমটি হোসেন ইনস্টিটিউট চত্বর এলাকার জমি ২০১০ সালে লিজ দিয়েছিল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এরই প্রতিবাদে সাংস্কৃতিক কর্মীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে লিজ বাতিল করা হয়। এখন দেখছি তাদের কেউ কেউ এই জমিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজে সম্পৃক্ত হয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি করা হোক, কিন্তু এম টি হোসেন ইনস্টিটিউটের জায়গায় হওয়া উচিত নয়। কারণ, লালমনিরহাট যে সংস্কৃতিসমৃদ্ধ নগরী ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি তারই কালজয়ী সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বরং সবার উচিত প্রতিষ্ঠান দ্রুত সংস্কার করে সেটি সংরক্ষণে এগিয়ে আসা।’
লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ড. আশরাফুজ্জামান মন্ডল বলেন, ‘সরকারের উচ্চমহলের আশু দৃষ্টি চাই যেন লালমনিরহাটের শতবর্ষী এই এম টি হোসেন ইনস্টিটিউটটি রক্ষা করে সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত নয়। লালমনিরহাটের গর্ব ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের এগিয়ে আসা উচিত।’