গত এক সপ্তাহ ধরে বৈদ্যারবাজার এলাকায় প্রতিদিন চার পাঁচটি ড্রেজার দিয়ে চলছে বালু ভরাটের কাজ। অভিযুক্ত শিল্প গ্রুপ হেরিটেজ পলিমার গ্রুপের ঠিকাদার ও স্থানীয় বৈদ্যারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ক্রয়কৃত জমিতেই বালু ভরাট করার কাজ চলছে।
এদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাশালী ব্যক্তিরা দোকান ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য নানাভাবে তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বৈদ্যারবাজার এলাকার সাতভাইয়াপাড়া ও চর লাউয়াদী মৌজায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি না কিনে এবং নদীর তীরবর্তী সরকারি খাস জমি ও হালট দখল করে অবৈধ ভাবে গত এক সপ্তাহ ধরে বালু ভরাট করে আসছে তারা।
স্থানীয় জমির মালিক বৈদ্যারবাজার ঘাট এলাকায় হাজী আজিজুল্লাহ জানান, ৭টি দাগে প্রায় ১ একর ১০ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে তার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের স্ত্রী সুরাইয়া করিম মুন্নীর বিরোধ চলে আসছে। এজন্য সুরাইয়ার বিরুদ্ধে তিনি আদালতে মামলা করেন। মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সুরাইয়া বিরোধপূর্ণ জমি হেরিটেজ পলিমার অ্যান্ড সেমি টিউবস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোস্তাফা কামাল ওরফে আল মোস্তফার কাছে বিক্রি করে দেন। পরে মো. মোস্তফা কামাল বিরোধকৃত জমিতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বালু ভরাটের কাজ দেয়।
স্থানীয় বৈদ্যারবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জনের একটি সিন্ডিকেট ওই জমির আশপাশের দোকানপাট উচ্ছেদের জন্য ১৫ দিনের মৌখিক নোটিশ দেন। দোকানপাট উচ্ছেদ না করলে ওই সিন্ডিকেট দোকানপাট ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
এছাড়াও দোকানপাট রেখেই গত এক সপ্তাহ ধরে কয়েকটি শক্তিশালী ড্রেজারের মাধ্যমে বালু ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে এলাকার প্রায় ১০-১২ জনের জমি না কিনেই অবৈধ্ভাবে দখল করে বালু ভরাটের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।
ভুক্তভোগী আজিজুল্লাহ বলেন, ‘আমার বিরোধকৃত সম্পত্তি নিয়ে আদালতে একটি মামলা রয়েছে। এ বিরোধকৃত সম্পত্তিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান ডা. আব্দুর রউফ একটি সিন্ডিকেট করে কোম্পানির পক্ষ নিয়ে সম্পত্তি দখল করে জোর করে বালু ভরাট কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি এ বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দেওয়ার পরও অজ্ঞাত কারণে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।’
ভুক্তভোগী মুজিবুর রহমানের অভিযোগ, আমরা সোনারগাঁও থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বালু ভরাট কাজ বন্ধ করার জন্য অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের কথাবার্তা রহস্যজনক মনে হয়েছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘বৈদ্যারবাজার সাতভাইয়াপাড়া মৌজায় আমাদের পৈত্রিক সম্পত্তির প্রায় এক বিঘা জমি রয়েছে। ওই জমি না কিনে আল মোস্তফা গ্রুপ নামের একটি কোম্পানির লোকজন বালু ভরাট করে জমি দখলে নিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছি। আদালত তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। এদিকে আদালতের দেওয়া আদেশ অমান্য করে ওই কোম্পানি বালু ভরাট করে যাচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা সোবহান মিয়া জানান, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট জোর করে সরকারি খাস জমি নদীর উৎস মুখ বন্ধ করে বালু ভরাট করছে। তিনি বলেন, ‘মেঘনা নদী পার হয়ে মারিখালি নদী দিয়ে পাশের কুমিল্লা জেলার হোমনা, চালিভাঙ্গা, নলচরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া চৌরাস্তায় আসা যাওয়া করে। কিন্তু উৎস মুখ বন্ধ হয়ে পড়লে তাদের যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হবে।’
স্থানীয় দোকানদার সাব্বির আহমেদ জানান, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও তার লোকজন আমাদের দোকান পাট ভেঙে জায়গা খালি করে দেওয়ার জন্য নানা ভাবে চাপ দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘দোকান ভেঙে দিলে কিভাবে সংসার চালাবো তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট এ বি সিদ্দিক জানান, মেঘনা নদীর র্তীরবতী ও মারিখালি নদীর উৎস মুখ বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। এই নদীর দুই তীরে হাজার হাজার একর ফসলি জমিতে ইরি বোরো ধান চাষ হয়। পানির অভাবে ফসল থেকে বঞ্চিত হবে কৃষক।
তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ভূমিদস্যুরা বালু ভরাট করছে।
এ ব্যাপারে পলিমার হেরিটেজ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের মোবাইল ফোনে বালু ভরাটের বিষয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে জানতে চাইলে তিনি ফোন কেটে দেন। এর পর একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দিনগুলোতে যাতে মারিখালি নদীতে কোনও বালু না পড়ে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সোনারগাঁও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বি এম রুহুল আমিন রিমন জানান, সরেজমিনে তদন্ত করে সরকারি খাস জমি ও হালট দখল করে অবৈধ ভাবে বালু ভরাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসময় কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়ে দুটি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কোম্পানির মালিককে উপজেলা ভূমি অফিসে আসার জন্য বলা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া বলেন, ‘অবৈধ বালু ভরাট বন্ধ রাখার জন্য নোটিশ দিয়ে সরকারি জায়গাতে লাল নিশান টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জমির মালিকানা নির্ধারণের পর ভূমির পরিবর্তন করার যে নীতিমালা রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। সরকারি জায়গায় বালু ভরাট করা হলে তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। কাজ বন্ধ রাখার নোটিশ অমান্য করে কেউ কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে বালু ভরাটের প্রতিবাদে সোমবার স্থানীয় এলাকাবাসী মানববন্ধন করেছেন। সোনারগাঁও প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বৈদ্যারবাজার, সাতভাইয়াপাড়া, রামগঞ্জ, চান্দেরকীর্তিসহ ৮ গ্রামের নারী-পুরুষ অংশ নেন। তারা সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেন।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী যুবলীগ নেতা রুবাইয়াত হোসেন শান্ত, সোনারগাঁও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান আহমেদ মোল্লা বাদশা, সোনারগাঁও স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি মাসুদ রানা মানিক, বৈদ্যারবাজার ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম সম্পাদক ফারুক হোসেন, মানবাধিকারকর্মী জাহানারা বেগম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আব্দুস সালাম বাবুল, সোনারগাঁও মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উর্মি আক্তার, সোনারগাঁও নদী রক্ষা কমিটির সদস্য ফরিদ হোসেন, ভুক্তভোগী হাজী আজিজুল্লাহ, গোলাম মর্তুজা লিংকন ও মজিবুর রহমান প্রমুখ।
সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা শাহিনুর ইসলাম বলেন, ‘এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি পেয়েছি। তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’