শান্তিচুক্তির পর দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ পার্বত্য অঞ্চল বিশ্ববাসীর কাছে মুক্ত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন গেরিলারা। সরকারও তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। সাময়িকভাবে পাহাড়ে রক্তের খেলা কিছুটা থামলেও এখনও বন্ধ হয়নি অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং চাঁদাবাজি।
দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করেছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন গেরিলারা। বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাদের দমনে সুফল পাওয়া যায়নি। অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতির পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
এই চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এক কনভেনশনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপর পাহাড়ে শুরু হয় দুই আঞ্চলিক দলের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। থেমে থেমে চলে দুই সংগঠনের হত্যা-পাল্টা হত্যা। ২০০১ সালে তিন বিদেশিকে অপহরণের মাধ্যমে শুরু হয় পাহাড়ে ‘অপহরণ বাণিজ্য’।
২০০৭ সালে জনসংহতি সমিতি থেকে বের হয়ে আরেক আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (এমএন লারমা) সৃষ্টি হয়। এরপর বিভিন্ন সময় তিনপক্ষের কর্মী-সমর্থক হত্যার মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলে পাহাড়ে।
আন্দোলনের ১৯ বছর পরে এসে ইউপিডিএফ থেকে বের হয়ে আরেকটি সংগঠন– ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (গণতান্ত্রিক) জন্ম নেয়। গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের অধিকার আদায়ের অঙ্গীকার নিয়ে চলতি বছরের ১৫ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে দলটি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, ‘চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। এখানে দরকার আমাদের স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক অবস্থা। শান্তি চুক্তির নামে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। অবৈধ অস্ত্রের কারণে এখানকার সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে। মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতা নেই।’ তিনি বলেন, ‘সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে, তখনই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের গতি পাবে।’
চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, ‘সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করার পর আবারও এর কাজ থেমে আছে। এর কাজের গতি বাড়াতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তির ফলে এখানে যে একটি বড় ধরনের সংঘাত ছিল– জনসংহতির সশস্ত্র শাখার সঙ্গে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সেটি বন্ধ হয়েছে। সেটা বন্ধ হওয়াতে মানুষ যে চলাফেরা করতে পারছে, বাজারঘাটে নির্বিঘ্নে যেতে পারছে সেখানে তো সুফল অবশ্যই আছে।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, রাঙামাটি জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবছার আলী বলেন, ‘যে শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অধিকার খর্ব করবে এবং অধিকার রক্ষাও করবে না– সেই শান্তিচুক্তি পার্বত্য বাঙালিরা মানে না, মানবে না। এটি একটি অবৈধ চুক্তি। শান্তিচুক্তি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বয়ে আনতে পারবে না।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, ‘আমি মনে করি চুক্তির মূল ধারাগুলো বাস্তবায়িত হলে যারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং সাধারণ জনগণ এত হতাশা বোধ করতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনের পর এর কাজের গতি তেমন দেখা যায়নি। লোকবলের সংকট, অফিস সংকট নিয়ে তারা আছে। এভাবে ভূমি কমিশন কাজ করতে পারে না। তাদের কাজের ব্যবস্থা সরকারকেই করে দিতে হবে।’
সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বলেছেন, ‘আমরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি এবং সরকারও স্বাক্ষর করেছে কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হতে পারছে না বা সরকার করছে না।’