সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সাবেক মেয়রসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা

জাকারিয়া আহমদ পাপলু, যুগেশ্বর চ্যাটার্জী, ছাব্বির আহমদ, জহিরুল ইসলাম (বাম থেকে)

ক্ষমতার অপব্যবহার ও এক কর্মচারীর সই জাল করে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিলেটের গোলাপগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া আহমদ পাপলু, একই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত সচিব যোগেশ্বর চ্যাটার্জীসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাপলুকে প্রধান আসামি করে গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) এ মামলা (মামলা নং–৮) দায়ের করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সিলেটের সহকারী পরিচালক দেবব্রত মন্ডল। দেবব্রত মন্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

জাকারিয়া আহমদ পাপলু ও যোগেশ্বর চ্যাটার্জী ছাড়া মামলার বাকি দুই আসামি হলেন– পৌরসভার কার্য সহকারী ছাব্বির আহমদ ও নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষারিক জহিরুল ইসলাম। জাকারিয়া আহমদ পাপলু গোলাপগঞ্জের রনকেলী নওয়াগ্রামের মৃত নঈম আলীর ছেলে, যোগেশ্বর চ্যাটার্জী মৌলভীবাজার কমলগঞ্জের মাধবপুর বামনগাঁও গ্রামের মৃত কৃষ্ণ চ্যাটার্জীর ছেলে, ছাব্বির আহমদ গোলাপগঞ্জ থানাধীন আমুড়া গ্রামের হেলাল আহমদের ছেলে ও জহিরুল ইসলাম গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ী পূর্বপাড়া গ্রামের সচেতন ৫৪/এ নং বাড়ির শহিদুল ইসলামের ছেলে। যোগেশ্বর চ্যাটার্জী বর্তমানে সিলেট নগরের উপশহর ই-ব্লকের ২নং রোডের ৩৫ নং বাসার ৩য় তলার ৫নং ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।

দুদকের সহকারী পরিচালক দেবব্রত মন্ডল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পৌরসভার ৬ লাখ ২৯ হাজার ৭শ’ ২২ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে দুদক বাদী হয়ে পাপলুসহ চার জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন আইনে মামলা করেছে। চার আসামি পরস্পরের যোগসাজশে পৌরসভার মুদ্রাক্ষরিক দুলাল আহমদের নামে দুইটি প্রকল্প বানিয়ে তার (দুলাল আহমদ) সই জাল করে অর্থ আত্মসাৎ করেন, যা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (সিআইডি) তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।’

মামলা এজাহার থেকে জানা গেছে, পাপলু ও যুগেশ্বর চ্যাটার্জী পৌরসভা (চুক্তি) বিধিমালা-২০০১ এর বিধি-৪ অনুসারে প্রকল্প কমিটি গঠন না করে এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ লঙ্ঘন করে ২০১৫ সালের ১১ জুন থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ১৪টি স্মারকে অফিস আদেশ সই করে ১৪টি প্রকল্প অনুমোদন করেন। এই প্রকল্পগুলোর বিল হিসেবে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৪শ’ ৭৪ টাকা তোলা হয়। এর মধ্যে চার আসামি ৬ লাখ ২৯ হাজার ৭শ’ ২২ টাকা আত্মসাৎ করেন।

দুদক সূত্র জানায়, সরেজমিন অনুসন্ধানে ১৪টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টির অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এছাড়া মাস্টার-রোলে উল্লেখিত শ্রমিকদের নাম-ঠিকানারও সন্ধান মেলেনি। দুলাল আহমদের নামে দুইটি প্রকল্প বানিয়ে ও তার সই জাল করে অর্থ আত্মসাৎ করেন চার আসামি। এছাড়া পৌরসভার বিলবোর্ড না লাগিয়ে আসামি ছাব্বির আহমদ ৩৯ হাজার ৭শ’ ২২ টাকা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে আসামি জহিরুল ইসলাম একলাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তৎকালীন চেয়ারম্যান জাকারিয়া আহমদ পাপলুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি দুর্নীতির অভিযোগে চেয়ারম্যান পদ থেকে বরখাস্ত হন পাপলু। ২০০৯ সালে পৌরসভার আত্মসাৎ করা ৯ লাখ ৭ হাজার ১৩০ টাকা সরকারি ফান্ডে ফেরত দিতে বাধ্য হন তিনি। ২০০৯ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি দুদক সিলেটের আঞ্চলিক কার্যালয়ের ১৮১ নং স্মারকের তদন্ত প্রতিবেদন ও ওই বছরের ২৮ জানুয়ারি ৭৩ নং স্মারকের নির্দেশে পাপলু এ টাকা ফেরত দিয়ে মামলা থেকে রেহাই পান।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর গোলাপগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে জাকারিয়া আহমদ পাপলুকে বিশাল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন বর্তমান মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। নতুন মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরীকে পৌরসভার যাবতীয় হিসাবনিকাশ ও নথিপত্র হস্তান্তর না করে তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যুগেশ্বর চ্যাটার্জি ও পাপলুর বিরুদ্ধে। এই অভিযোগসহ সম্পদের তথ্য গোপন এবং পৌরসভার ১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা নয়ছয়ের পৃথক আরও ৩টি অভিযোগের তদন্ত শেষে মামলা হয়েছে।

মুদ্রাক্ষরিক দুলাল আহমদ জানান, তার সই জালিয়াতি করে কারা টাকা আত্মসাৎ করেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে তিনি কোনও সই করেননি। বক্তব্যের জন্য কল করা হলে আসামিদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। গোলাপগঞ্জ থানার ওসি ফজলুল হক শিবলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলটি দুদক তদন্ত করবে।