গত ১২ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানার শাহমীরপুর এলাকার একটি বাড়িতে ডাকাতির পর ওই পরিবারের চার নারীকে ধর্ষণ করে ডাকাতরা। এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে বলা হয়, ঘটনাস্থল বড়ওঠান ইউনিয়নটি পটিয়া থানার অধীন। পরে পটিয়া থানায় গেলে বলা হয়, সেটি কর্ণফুলী থানাতেই পড়েছে। ওই ঘটনার পাঁচ দিন পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের হস্তক্ষেপে ১৭ ডিসেম্বর মামলা নেয় কর্ণফুলী থানা পুলিশ। এরপর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয় তিন জনকে। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনও তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত আসামিদের আড়ালে রাখতেই ওসি এই তিন জনকে গ্রেফতার করেছেন। কিংবা পূর্ব শত্রুতার জেরে ফাঁসানোর জন্যই গ্রেফতার করা হয়েছে এই তিন জনকে। তাদের অভিযোগ যে অমূলক নয়, তা প্রমাণ হতে শুরু করে এই মামলার তদন্তভার পিবিআই গ্রহণ করার পর।
২৬ ডিসেম্বর তদন্ত শুরুর পর পিবিআই জানায়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত যাদের নাম পাওয়া গেছে, তাদের কাউকেই গ্রেফতার করা হয়নি। আবার পিবিআইয়ের গ্রেফতার করা ব্যক্তিরাও বলছে, ওসির গ্রেফতার করা ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘটনার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা বলছেন, প্রকৃত আসামিদের আড়াল করতেই কর্ণফুলী থানা পুলিশ গড়িমসি করেছে। তা না হলে, থানা পুলিশ এই ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের নাম পিবিআই তদন্তে কেন আসবে না? পুলিশ প্রকৃত আসামিদের বাদ দিয়ে কেন অন্যদের গ্রেফতার করেছে? মামলার তদন্ত ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতেই কি ওসি মোস্তফা ইচ্ছাকৃতভাবে এ কাজ করেছেন?
কর্ণফুলী উপজেলার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফারুক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনা জানার পর প্রাথমিকভাবে আমরা ধারণা করেছিলাম, স্থানীয় বখাটে ছেলেরা হয়তো ঘটনাটি ঘটিয়েছে। থানা পুলিশও হয়তো সেই ধারণা থেকেই এলাকার বখাটেদের গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ঘটনার পর ভিকটিমরা যেভাবে বর্ণনা দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে পিবিআই যাদের গ্রেফতার করেছে, তারাই প্রকৃত আসামি। পুলিশ প্রকৃত আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি।’
বড়ওঠান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিদারুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কর্ণফুলী থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করায় তখনই সন্দেহ হয়েছিল। পিবিআই তদন্ত শুরুর পর বিষয়টি এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রকৃত আসামিদের আড়াল করতেই পুলিশ মামলা নিতে চায়নি। এ কারণেই হয়তো ঘটনা জানার পরও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেনি।’
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে চেয়ারম্যান দিদারুল বলেন, ‘যদি তাই না হয়, তবে তারা (থানা পুলিশ) যাদের গ্রেফতার করেছে, এই ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাওয়া যাবে না কেন?’
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, পিবিআইয়ের তদন্ত ঠিক পথেই এগুচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আমার মনে হয় একটু ধৈর্য্য ধরলেই প্রকৃত সব তথ্য বেরিয়ে আসবে।’
এদিকে, এই মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যাদের গ্রেফতার করেছি, আগেই ঘটনার সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তারা নিজেরাও ওই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।’
এই মামলায় কর্ণফুলী থানার ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কর্ণফুলী থানা পুলিশ এই মামলায় যে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে, তাদের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে আমরা এখনও কোনও তথ্য পাইনি। তাদের কী কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি কর্ণফুলী থানা পুলিশই বলতে পারবে।’
এর আগে গত ২৫ ডিসেম্বর নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (বন্দর) হারুন অর রশিদ হাজারী নিজেও এ ঘটনায় কর্ণফুলী থানার ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা নেওয়া থেকে শুরু করে তদন্ত পর্যন্ত পুলিশের আংশিক ব্যর্থতা রয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। চাঞ্চল্যকর এই মামলায় পুলিশ চাইলে আরও ভালো ভূমিকা পালন করতে পারত।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ওসি সৈয়দুল মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। তাই ঘটনার পর থেকে থানা পুলিশ, ডিবি, পিবিআই সবাই কাজ করেছে। আমরা টিম ওয়াইজ কাজ করেছি। আমরা যে লাইন থেকে কাজ করেছি, সেদিক থেকে সফলতা আসেনি। আবার পিবিআই তাদের মতো তদন্ত করে সাফল্য পেয়েছে। পিবিআই তো পুলিশেরই একটি ইউনিট। তাই এই সফলতাও পুলিশেরই।’
তার নেতৃত্বে গ্রেফতার করা তিন জনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকার বিষয়ে ওসি মোস্তফা বলেন, ‘আমরা যাদের সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করেছি, তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলে মূল চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ যাবে। এটাকে অন্য কোনোভাবে দেখার কিছু নেই।’
আরও পড়ুন-
ভূমিমন্ত্রীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে বাড়ি দখলের অভিযোগ
হাওরের হাহাকার ও জঙ্গিবাদের অস্থিরতায় কেটেছে বছর