কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একাধিক রোহিঙ্গা মাঝির (সর্দার বা নেতা) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আরসার হামলার যে দাবি করা হয়, তা রোহিঙ্গাদের জন্য বড় বিপদ বয়ে এনেছে। তারা দাবি করেছেন, আরসা রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের কথা বললেও মূলত এটি মিয়ানমার সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। কারণ, মিয়ানমার সরকার যখনই রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সমঝোতার দিকে যায়, ঠিক তখনই আরসার হামলার ঘটনা ঘটে। আর এ হামলার অজুহাত দেখিয়ে সমঝোতার পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন, রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আদৌ কি আরসা হামলা করেছিল? গত দু’দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এই মনোভাব জানা গেছে।
একই ক্যাম্পের আয়ুব আলী মাঝি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখে বারবার ধুলো দিচ্ছে। মূলত আরসা মিয়ানমারের সৃষ্টি। আরসা নামের কোনও সংগঠন রাখাইনে আছে বলে মনে হয় না। মিয়ানমার সরকার আরসার হামলার কথা বলে রাখাইনে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক মানুষকে দেশছাড়া করতে চাইছে। আমরা আরসাকে বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আমাদের জন্মভূমি রাখাইনে ফিরে যেতে।’
কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিক বলেন, ‘রাখাইনে আরসা নামে কোনও সংগঠন নেই। আরসা আছে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। এটি মিয়ানমার সরকারের সৃষ্টি। রাখাইনে বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্রের অংশ। আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।’
টেকনাফে লেদা ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের নাটক আমরা বুঝে গেছি। রাখাইনে এ পর্যন্ত কোনও হামলা হয়নি। আরসার অজুহাতে আমাদের দেশছাড়া করেছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে। মিয়ানমার চাইছে যেকোনও উপায়ে রাখাইন খালি করতে। এতে তারা অনেকটা সফল।’
একই ক্যাম্পের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি দুদু মিয়া বলেন, ‘চীনের জন্য রাখাইন জনশূন্য করার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। সে হিসেবে কাজ করছে মিয়ানমার।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার এই বয়সে রাখাইনে আরসা এবং আল আকিন নামের কোনও সংগঠনের সদস্য চোখে পড়েনি। আর তারা কেনই বা হামলা করবে। আমরা নাগরিকত্ব চাই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আমরা আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।’
কুতুপালং নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ ইউনুছ আরমান বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করা কঠিন। তারা প্রতিনিয়ত কোনও না কোনও কৌশল অবলম্বন করে। যেকোনও মূল্যে রাখাইনে জনশূন্য করবে। অর্থনৈতিক জোন করতে চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের চুক্তিই এমন ইঙ্গিত দেয়। রাখাইনে শুধু মুসলিম জনগোষ্ঠী নয়, হিন্দুদেরও বিতাড়িত করা হচ্ছে। আরসার হামলার অজুহাতে মিয়ানমার সরকার এ কাজে সফল হয়েছে। মিয়ানমারের কৌশলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও হাত দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’
২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইনে পুলিশ পোস্টে হামলার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে ৮৭ হাজার ৯০০ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমার সরকারের এই বর্বর নির্যাতনের নিন্দা জানায় এবং অং সান সু চির নির্দেশে গঠন করা কফি আনান কমিশন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট দেওয়ার একদিনের মাথায় ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে আবারও হামলার অভিযোগ তোলে মিয়ানমার সরকার। এ ঘটনায় মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়কারী সংগঠন আরসা এই হামলা চালিয়েছে।
পরে রাখাইনে তল্লাশির নামে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে নৃশংস নির্যাতন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও ব্যাপক নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ছয় লাখ ৭২ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা। নতুন-পুরনো মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১২ লাখের ওপরে। এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত নভেম্বরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার একটি চুক্তিও হয়।