সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল দুই পরীক্ষার্থীর

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই পরীক্ষার্থী রাকিবুল হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানমোস্তাফিজুর রহমান ও রাকিব উদ্দিন— দু’জনেরই উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। দুই সহপাঠী ছিল বিদ্যালয়ে স্কাউটের সদস্য। ছাত্র হিসেবেও এই দুই এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল বেশ মেধাবী। দু’জনের মধ্যে মোস্তাফিজুরের বাবা সেনা সদস্য। তবে দুই সহপাঠীর পরিবারের সদস্যদেরই স্বপ্ন ছিল— তারা সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পেশাজীবন শুরু করবে। দুই সহপাঠীও পরিবারের এমন স্বপ্নকেই লালন করত। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা তাদের সব স্বপ্ন-আশা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। কেবল এই দুই সহপাঠীই নয়, মোস্তাফিজুরের বাবাও প্রাণ হারিয়েছেন একই দুর্ঘটনায়। দুই পরিবারে তাই এখন কেবল শোকের মাতম।
সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার তারাপুর টাওয়ার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী রাকিবুল হোসেন (১৬) ও মোস্তাফিজুর রহমান (১৬) এবং মোস্তাফিজুর রহমানের বাবা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট আব্দুল মোমিন (৪৫)। ছেলে মোস্তাফিজুর ও তার সহপাঠী রাকিবকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা দেন মোমিন। পথে এক ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তিন জনের মৃত্যু হয়।
বিকালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশের অপেক্ষায় দুই বাড়ির ভেতরে ও বাইরে মানুষের জটলা। রাকিব উদ্দিনের বাড়ি পুঠিয়া উপজেলার কাজিপাড়া গ্রামে, মোস্তাফিজুরের বাড়ি হলদার পাড়ায়। দুই বাড়িতেই স্বজনসহ প্রতিবেশীরা উপস্থিত হয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বাকিদের। গোটা এলাকাতেই শোকের ছায়া।
রাকিব ও মোস্তাফিজুর দু’জনই ছিল বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে দুই সহপাঠীই পেয়েছিল জিপিএ ৫। জেএসসিতে এসে মোস্তাফিজুর পেয়েছিল জিপিএ ৪.৮৬, রাকিব উদ্দিন ৪.৫০।
নিহত পরীক্ষার্থীদের বাড়িতে শোকের ছায়ামোস্তাফিজুর রহমানের হলদার পাড়া বাড়িতে ভাড়া থাকেন তার শিক্ষক ও পুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শামীম উদ্দিন। তিনি জানালেন, মোস্তাফিজুরের আরও এক ভাই আছে। সে বাবা আব্দুল মোমিনের সঙ্গে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে থাকে। আর মোস্তাফিজুর পুঠিয়ায় থাকে মায়ের সঙ্গে। ছেলের পরীক্ষার জন্য ৩১ জানুয়ারি এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলেন মোমিন। ছেলেকে নিয়ে তিনিই পরীক্ষাকেন্দ্রে যাতায়াত করতেন।
শামীম উদ্দিন বলেন, ‘মোস্তাফিজুরকে নিয়ে তার বাবার স্বপ্ন ছিল, সে একদিন সেনা কর্মকর্তা হবে। এসএসসি’র পর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে বিএমএ লং কোর্সের কমিশন র্যাং কে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু এক দুর্ঘটনা তাদের দু’জনকেই কেড়ে নিয়েছে।’
অন্যদিকে, কাজিপাড়া গ্রামে রাকিব উদ্দিনের মাকে ঘিরে রেখেছেন আত্মীয়-স্বজনরা। এমন শোকাবহ পরিবেশের তার মা রাবেয়া বেগম বলেন, ‘‘সকালে নাস্তা করে পরীক্ষার জন্য বের হয়ে গেল (রাকিব)। বলে গেল, পরীক্ষা শেষ করে এসে খাবে। আমাদের বাড়িতে কারেন্ট (বিদ্যুৎ সংযোগ) নেই। তাই পরীক্ষার একমাস আগে থেকে বন্ধুর বাসায় গিয়ে পড়ালেখা করেছে। আগের দুই পরীক্ষা ভালো দিয়েছে। রাকিব বলত, ‘আমি লম্বা আছি। ভালোভাবে পড়ালেখা করে সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে পরীক্ষা দেবো। চাকরি হয়ে গেলে আর সংসার চালাতে অসুবিধা হবে না।’
নিহত দুই পরীক্ষার্থীর নিজেদের স্কুলপুঠিয়া পি এন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু প্রশান্ত কুমার চৌধুরী বাংলা ট্রিবিকউনকে বলেন, ‘ওরা দু’জনই মেধাবী ছিল। বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা মেনে চলত। তবে রাকিব ছেলেটার পরিবার খুব দরিদ্র। তার বাবা অন্যের পুকুর পাহারা দেন, আর মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। তাই আমরা বিনামূল্যে রাকিবের পড়ালেখা চালিয়ে গেছি। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।’
দুই পরীক্ষার্থীর সহপাঠী আতিক হাসান আরিফ মন খারাপ করে দাঁড়িয়েছিল রাকিবের বাড়িতে। জিজ্ঞাসা করতেই বলে, ‘কাল (রবিবার) বিকালে মোস্তাফিজুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। পরীক্ষার খোঁজ-খবর নিলাম। আজ (সোমবার) একটু আগেই পরীক্ষাকেন্দ্রের পথে বেরিয়ে পড়েছিলাম। পরে বাড়ি এসে শুনলাম, একসঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য রাকিব এসেছিল আমাদের বাড়িতে। আমাকে না পেয়ে পরে রাস্তায় গিয়ে মোস্তাফিজুর ও তার বাবাকে পায়। পরে তারা একসঙ্গে মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা হয়। এখন ভাবতেই খুব মন খারাপ হচ্ছে। কী থেকে কী হয়ে গেলো!’
স্থানীয় একটি কলেজে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হৃদয় ছুটে এসেছেন মোস্তাফিজুরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে। তিনি বলেন, ‘আমি কলেজে পড়লেও ওর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আমরা একসঙ্গে খেলতাম। আমার কাছে অনেক বিষয় দেখিয়ে নিত। আমাকে খুব পছন্দ করত। আমিও ওকে খুব পছন্দ করতাম। এখন ভাবতেই পারছি না, এমন একটি প্রাণবন্ত ছেলে আর নেই।’
আরও পড়ুন-
দুই পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর দায় নেবে কে?