‘পাকিস্তানি সেনাদের মতো আগুন দিয়ে আমাদের সব পুড়িয়ে দিলো’

আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া বসতঘর (ছবি- প্রতিনিধি)

টিনের চালের আধা-পাকা ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাস করতেন তারা। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনায় আটক হওয়ার আতঙ্কে সবাই বাড়ি ছাড়েন। এই সুযোগে প্রতিপক্ষের লোকজন ২০-২৫টি বসতঘর আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। পরপর দুই রাতে  কয়েক দফায় এসব ঘরে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।  তবে যাদের বিরুদ্ধে এই অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তারা দাবি করছেন, অভিযোগকারীরা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়েছে।

গত মঙ্গল ও বুধবার (১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি) দিনগত রাতে হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নে মুড়িয়াউক গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২০-২৫টি ঘর পুড়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল আধা-পাকা। ঘরগুলোর আধপোড়া খুঁটি ও টিন ছাড়া সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধু ঘর নয়; আগুনে পুড়ে মরেছে গরু, হাঁস, মোরগ ও কবুতর। পুড়ে যাওয়া ঘরের ছাই থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে উঠানে বসে কান্নাকাটি করছেন নারীরা। আর খাবারের জন্য কান্নাকাটি করছে শিশুরা।

বসতঘর পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ঘরগুলোতে আগুন দেওয়ার আগে দুর্বৃত্তরা লুটপাট চালায়। এসময় হামলাকারীরা টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেয়।

আগুনে পুড়ে যাওয়া মোরগ (ছবি- প্রতিনিধি)

স্থানীয় সূত্র জানায়, মুড়িয়াউক ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান মোল্লা ও মুড়িয়াউক গ্রামের মাসুক মিয়া তালুকদারের লোকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ আছে। এর জের ধরে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় নুরুজ্জামান মোল্লার পক্ষের কুদ্দুছ মোল্লাকে উদ্ধার করে প্রথমে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল ও পরে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। এখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চার দিনের মাথায় মঙ্গলবার কুদ্দুছ মোল্লা মারা যান। এ ঘটনায় ৯ জনকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে আটক আতঙ্কে মাসুক মিয়া তালুকদারের পক্ষের লোকজন, বিশেষ করে পুরুষরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।

সূত্র আরও জানায়, মঙ্গলবার রাতে কুদ্দুছ মোল্লার লাশ বাড়ি নিয়ে আসেন তার স্বজনরা। পরে ওই রাতেই নুরুজ্জামান মোল্লার পক্ষের লোকজন মাসুক মিয়া তালুকদারের পক্ষের লোকজনের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা প্রথমে লুটপাট করে এবং পরে ২০-২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে ওই ঘরগুলোতে থাকা নারী ও শিশুরা বাইরে বের হয়ে আসতে পারায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

ক্ষতিগ্রস্ত আলেয়া খাতুন নামের এক বৃদ্ধা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যা করেছিল রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা, সেটাই করলো প্রতিপক্ষের লোকজন। তারা পাকিস্তানি সেনাদের মতো হামলা চালিয়ে আগুন দিয়ে সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। কোনও রকমে ঘর থেকে বের হতে পারায় প্রাণে বেঁচে গেছি।’

খোলা আকাশের নিচে ক্ষতিগ্রস্ত এক পরিবার (ছবি- প্রতিনিধি)

এ ব্যাপারে মাসুক মিয়া তালুকদার বলেন, ‘গত ইউপি নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর নুরুজ্জামান মোল্লা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। সে পর পর চার বার মারামারির ঘটনা ঘটায়। সেজন্য তাকে পুলিশ গ্রেফতারও করেছিল। এরপর ছাড়া পেয়ে আমার গ্রামের ২০-২৫টি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। এর আগে বাড়িতে লুটপাট চালিয়েছে।’

নুরুজ্জামান মোল্লার ছোট ভাই আরমান বলেন, ‘আমাদের ফাঁসানোর জন্য তারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন দিয়েছে। আমাদের পক্ষের লোকজন এ ধরনের কোনও হামলা চালায়নি।’

লাখাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি- তদন্ত) দেওয়ান মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসেছি। প্রতিপক্ষের লোকজনই এ আগুন লাগিয়েছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।’ অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘রাতে লুটপাটও হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।’