ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি: পাহাড়ের কোলে আগুন দিনের স্মারক

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি

১৯৩৯ সাল। বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে অশান্তির ছায়া। চারদিকে শুরু হয়েছে বিশ্বযুদ্ধের দামামা। দিন নেই, রাত নেই, বোমার গুরুম গুরুম আওয়াজ। অস্ত্রের গর্জন আর ছোপ ছোপ রক্তে শান্তিকামী মানুষের মনে আতঙ্ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ সর্বগ্রাসী মরণছোবল ভারতীয় উপমহাদেশের যেসব জায়গায় লেগেছিল, তার মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকের সেই যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ স্মৃতিময় স্থান কুমিল্লার ময়নামতি রণ-সমাধিক্ষেত্র, যা ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি নামেই পরিচিত।



কুমিল্লা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ মহাসড়ক সংলগ্ন ক্যান্টনমেন্টের টিপরা বাজার ও ময়নামতি সাহেবের বাজারের মাঝামাঝি কুমিল্লা-সিলেট সড়কের বামপাশে অবস্থিত ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। সাড়ে চার একর পাহাড়ি ভূমিজুড়ে গড়ে তোলা এ ওয়ার সিমেট্রি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী বহন করে চলেছে।
জানা যায়, ১৯৪১-১৯৪৫ সালে বার্মায় (বর্তমানে মিয়ানমার) সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫ হাজার কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মিয়ানমার, আসাম এবং বাংলাদেশে ৯টি রণসমাধিক্ষেত্র তৈরি কর হয়। এর অন্যতম একটি ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি। এখানে ঘুমিয়ে আছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ৭৩৭ জন সৈন্য। এটি মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত তৎকালীন ভারতীয় ও বৃটিশ সৈন্যদের কবরস্থান।
১৯৪৩-১৯৪৪ সালে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি তৈরি হয়। এটি কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন প্রতিষ্ঠা করে এবং তারা এ সমাধিক্ষেত্র দেখভাল করে আসছে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সব ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনা-সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় প্রচুর দর্শনার্থী নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এখানে আসেন। বছরের অন্যান্য সময়ও এখানে দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে কুমিল্লার ময়নামতিতে একটি বড় হাসপাতাল ছিল। এছাড়া, কুমিল্লা ছিল যুদ্ধ-সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্র, বিমান ঘাঁটি ও সেনানিবাস। মূলত হাসপাতালে মৃত ব্যক্তিদের জন্য এ সমাধিস্থল তৈরি করা হয়। তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আনা মরদেহ সমাধিস্থ করার উদ্দেশ্যে সমাধিস্থলটি সম্প্রসারিত করা হয়। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক। ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও সমাধিস্থলের আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও যে কারও নজর কাড়ে।
যুদ্ধে নিহতরা হলেন– যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের চার জন, দক্ষিণ আফ্রিকার একজন, অবিভক্ত ভারতের ১৭৮ জন, জিম্বাবুয়ের তিন জন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, মিয়ানমারের একজন, বেলজিয়ামের একজন, পোল্যান্ডের একজন ও জাপানের ২৪ জন সৈন্য।
সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে রয়েছে ঘর, যার ভেতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লেখা রয়েছে। ভেতরে যাওয়ার জন্য রয়েছে প্রশস্থ পথ, যার দুই পাশে সারি সারি কবরের ফলক। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যু তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক রয়েছে। প্রশস্থ পথ ধরে সোজা সামনে রয়েছে সিঁড়ি দেওয়া বেদী, তার ওপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় প্রতীক ক্রুশ। বেদীর দুই পাশে রয়েছে আরও দুইটি ঘর। এসব ঘরের মধ্যদিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পেছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরও বহু কবর-ফলক। প্রতি দুইটি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ রয়েছে। এছাড়া, পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে অনেক গাছ। যখন কৃষ্ণচূড়া গাছ তার লাল ডালপালা ছড়িয়ে দেয়, তখন চোখ ফেরানো যায় না। ঝিরঝিরে হাওয়ায় লাল ফুল পড়তে থাকে সমাধির গায়ে, এ এক অন্যরকম দৃশ্য। মনে হয়, গাছগুলোও ফুল ছিটিয়ে যোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা নগরী থেকে দুই ভাগ্নিকে ওয়ার সিমেট্রির ইতিহাস জানাতে নিয়ে আসেন আ ফ ম আহসান উদ্দিন টুটুল নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘ভাগ্নিদের নিয়ে এসেছি। এখানে যুদ্ধের বর্ণনা থাকায় শিক্ষার্থীরা সহজে বিষয়গুলো জানতে পারছে। এ সমাধিক্ষেত্রের পবিত্রতা রক্ষায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
একই মত দেন সমাধিক্ষেত্রের ব্যবস্থাপক আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ‘সমাধিক্ষেত্রে অনেকে আড্ডা দিতে আসেন, যা ঠিক নয়। এর পবিত্রতা রক্ষায় সবার সচেতন থাকা প্রয়োজন।’