শুধু নারগিস নন, উপজেলার নারী কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে আগে ঝামেলা পোহাতে হলেও এখন তা এড়াতে পারছেন স্বাচ্ছন্দ্যেই। কৃষি ফসল উৎপাদন করে এখন সফলতার দ্বারপ্রান্তে নারী কৃষকরা।
মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে বরগুনার প্রান্তিক জনপদের নারীরা নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি নিজেরাই বিক্রি করছেন সরাসরি ক্রেতাদের কাছে। নেই বসার জায়গার কোনও সমস্যা, দিতে হয় না কোনও খাজনা। ক্রেতারাও বিষমুক্ত শাকসবজি পেয়ে কিনছে আগ্রহ নিয়েই। উৎপাদিত সবজি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করায় লাভবানও হচ্ছেন নারী কৃষকরা।
গ্রামীণ নারীদের উৎপাদিত শাকসবজি বাজারজাতকরণের লক্ষ্যে বরগুনা পৌর শহরের কলেজ রোড এলাকায় সম্প্রতি যাত্রা শুরু করে কৃষাণী বাজার। যেখানে বরগুনার প্রান্তিক নারী কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের না দিয়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। বাজারটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে তারা বরগুনার কাঁচাবাজারে সবজি বিক্রি করতে চাইলেও তাদের বসার স্থান পেতে ঝামেলা হতো। বিক্রি করতেও ঝামেলায় পড়তে হতো। স্থানীয় সবজি বিক্রেতাদের রোষানলে থাকতে হতো কৃষাণীদের। তাই কমমূল্যে পাইকারের কাছেই বিক্রি করতে হতো তাদের উৎপাদিত সবজি। তার ওপর দিতে হতো খাজনা।
এই কৃষাণীদের জন্য একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কৃষাণী বাজারের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রির সুবিধা করে দেয়। যে কারণে এখন মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে নির্বিঘ্নে বিক্রি করছেন তাদের উৎপাদিত পণ্য। বাজারটি সকালে শুরু হয়ে দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।
কৃষাণী বাজারের সবজি বিক্রেতা সোনাতলা গ্রামের কৃষক রাবেয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এর আগে কাঁচাবাজারে সবজি বিক্রি করতে গেলে বসার স্থান পেতাম না। পুরুষের সঙ্গে ঝগড়া করে বসতে হতো। ক্রেতাও কম ছিল। পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিক্রি করতে হতো। তখন অনেক কষ্ট হতো, দাম কম পেতাম। এখন ভালোই আছি।’ এভাবে বিক্রির সুযোগ পেলে আগামী দিনে আরও বেশি জমিতে ফসল উৎপাদন করা যাবে বলেও তিনি আশা করেন।
বরগুনা সদর উপজেলার রোডপাড়া গ্রামের রাধারানী ট্রিবিউনকে বলেন, 'বাড়িতে ছেলেকে নিয়ে ফসল ফলাই। আর বাজারে বিক্রি করার জন্য নিজে এই কৃষাণী বাজারে বিক্রি করি। এখানে কোনও ধরনের ঝামেলা ছাড়াই বিক্রি করা যায়। দামও ভালো পাই। ক্রেতাদের চাহিদাও অনেক।’
তাজা শাকসবজি নিয়ে প্রতিদিন বাজারে আসে কৃষাণীরা। এই সবজিতে নেই কোনও বিষ। পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করেন ফেরোমন ফাঁদসহ বিভিন্ন কৌশল। তাই বিষমুক্ত শাকসবজি কিনতে ক্রেতারাও যাচ্ছেন কৃষাণী বাজারে। কোলাহলমুক্ত এই কৃষাণী বাজারে নারী ক্রেতারাও কেনাকাটা করছেন স্বাচ্ছন্দ্যে।
সোনাতলা গ্রামের কৃষাণী নারগিস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন আর পাইকার নেই। তাই দাম একটু বেশি পাই। আমাদের শাক ও সবজি পাইকারের কাছে বিক্রি করলে দাম কম পেতাম। আমাদের কাছ থেকে সবজি নিয়ে বাজারের দোকানে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হতো। এগুলো আমাদের নিজেদের উৎপাদিত সবজি। এই সবজিতে কোনও বিষ দেই না। তাই ক্রেতারাও আগ্রহ করে নিচ্ছেন।’
মো. মনিরউজ্জামান নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘কৃষাণী বাজার হওয়ার পর এখান থেকে শাকসবজি কিনি। প্রতিদিন সকালে এখান থেকে তাজা শাকসবজি কিনে থাকি। তুলনামূলক বাজারের চেয়ে দামও কম।’
কৃষাণী বাজারে সবজি কিনতে যাওয়া আইরিন পারভিন ও হামিদা বেগম বলেন, ‘আগে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে ঝামেলা পোহাতে হতো। এখানে কৃষাণীদের কাছ থেকে বাজার করছি। ভালোই লাগে। বিশেষ করে এই কৃষাণীরা ক্ষেতের ফসলে বিষ দেন না। তাই বিষমুক্ত শাকসবজি পাচ্ছি।’
কৃষাণী বাজারের উদ্যোক্তা জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসনেয়ারা হাসি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারী কৃষকদের এগিয়ে নিতেই এই কৃষাণী বাজার স্থাপন করা হয়েছে। নারীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে গিয়ে বিক্রি করতে পারেন না। পুরুষ বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। না হলে পাইকারি বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হয়। এখানে মধ্যস্বত্বভোগী নেই। কৃষাণীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রেতার হাতে বিক্রি করছেন। যা বিক্রি করছেন, তা নিজেরই থাকছে। এ টাকা থেকে অন্য কাউকে খাজনা বা তোলা দিতে হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নিতেই এই উদ্যোগ। এখানে অনেক নারী কৃষককে বিষমুক্ত ফসল উৎপাদনের বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনা করে কলেজ রোডে অস্থায়ীভাবে কৃষাণী বাজার স্থাপন করা হয়েছে।’
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিচুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কৃষাণী বাজার একটি ব্যতিক্রমী বাজার হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রসার লাভ করেছে। নারী কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল প্রতিদিন সকালে এনে বিক্রি করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শহরের মধ্যে সরকারের খাসজমি দেখে কৃষাণীদের জন্য একটি আলাদা মার্কেট করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি।’