বগুড়ার ধুনট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার জালাল উদ্দিনের সনদ ও গেজেট বাতিল হয়েছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এর ৫১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শনিবার (২৪ মার্চ) এলাকায় এ খবর জানাজানি হলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দেয়। ধুনট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ওবাইদুল হক এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
জানা যায়, জালাল উদ্দিন বয়স জালিয়াতি করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে চাকরিসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তার দাপটে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।
এ ব্যাপারে ধুনট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ওবাইদুল হক বলেন, ‘আমি এ ঘটনার তদন্তের দায়িত্বে ছিলাম। তদন্ত চলাকালে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন আমাকে উপজেলা প্রশাসনের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সামনে হুমকি দিয়েছিলেন। এছাড়া সনদ বাতিলের গেজেট প্রকাশ হওয়ায় তিনি নানাভাবে আমাকে হয়রানি করার চেষ্টা করছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কয়েকদিন আগে জালাল উদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিলের গেজেট পেয়েছি। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন ২০১০ সালের জুলাই থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা বোনাসসহ ৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পেয়েছেন। এছাড়াও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে চাকরি, ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছেন।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য জালাল উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে স্থানীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জালাল উদ্দিনের বয়স ছিল ১০ বছর ২ মাস ২৫ দিন। পরে তিনি বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হন এবং সরকারি চাকুরিসহ সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন। প্রভাবখাটিয়ে তিনি ধুনট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার পর্যন্ত হয়েছিলেন।’
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘জালাল উদ্দিন দীর্ঘদিন কমান্ডারের দায়িত্ব পালনকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। পরে আমি ও মহসিন আলী তার (জালাল উদ্দিনের) এসএসসি পাশের সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করি। এতে জালাল উদ্দিনের জন্ম তারিখ ১৯৬১ সালের ২ জানুয়ারি লেখা আছে। সে হিসেবে যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর ২ মাস ২৫দিন। একজন শিশু কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এরপর জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট হয়েছিল। তখন জালাল উদ্দিন দাবি করেছিলেন- তার বয়স ঠিকই আছে, স্কুলে ভর্তির সময় শিক্ষকরা বয়স কম করে দিয়েছেন।’
মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, জালাল উদ্দিন প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে কমান্ডারের পদ আঁকড়ে থেকে সরকারের ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২ মে জালাল উদ্দিনের বয়স জালিয়াতির প্রমাণসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন। মন্ত্রী অভিযোগটি যাচাই করে নীতিমালা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে বগুড়ার ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। নির্বাহী কর্মকর্তা এ ব্যাপারে তদন্ত করতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ওবাইদুল হককে দায়িত্ব দেন। সমাজসেবা কর্মকর্তা তদন্ত করে জালাল উদ্দিনের বয়স জালিয়াতির সত্যতা পান। তিনি এ ব্যাপারে প্রতিবেদন দিলে নির্বাহী কর্মকর্তা সেটি বগুড়ার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক সুফিয়া নাজিমের কাছে পাঠান। তিনি গত বছরের ১৪ নভেম্বর জালাল উদ্দিনের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি (স্মারক নং-১৭৭২) পাঠান। পরবর্তীতে জামুকার ৫১তম সভায় জালাল উদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধার সনদ ভুয়া প্রমাণিত হলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সচিবকে সুপারিশ করা হয়। গত ৩ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত পত্রে জালাল উদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট বাতিল করা হয়েছে বলে জানানো হয়।