ফ্ল্যাটটি এখনও খালি, রয়েছে গুলির চিহ্ন

এ বাড়িতেই আস্তানা গেঁড়েছিল জঙ্গি তামিম চৌধুরীসেদিনের সেই লোমহর্ষক ঘটনার কথা মনে করতে গিয়ে এখনও শিউরে ওঠেন ওই বাড়ির বাসিন্দারা। ফ্ল্যাটটিও এখনও খালি। কোনও ভাড়াটিয়া সেটিতে উঠছেন না। ঘটনার প্রায় দুই বছর পাঁচ মাস পরও ফ্লোরের টাইলস ও দরজায় একাধিক গুলির চিহ্ন রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ায় নুরুদ্দিন দেওয়ানের বাড়িতে ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’ অভিযানে তিন জঙ্গি নিহত হয়। তাদের মধ্যে গুলশানে জঙ্গি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীও ছিল। তারা বাড়িটির তৃতীয় তলার দক্ষিণ পাশের ওই ফ্ল্যাটটিতে ভাড়া থাকতো। উত্তর পাশের ফ্ল্যাটটি আড়াই বছর পর গত মাসে ভাড়া হয়েছে।

গুলির দাগ দেখাচ্ছেন বাড়ির মালিকগত মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) বিকালে পাইকপাড়া বড় কবস্থানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিন তলার বাড়িটির নিচতলায় ও ভবনের পাশের টিনশেড ঘরগুলোতে ভাড়াটিয়া আছেন। দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে বাড়িওয়ালা নুরুদ্দিন দেওয়ান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন। তৃতীয় তলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া এসেছে। কিন্ত দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ। এই ফ্ল্যাটটিতেই জঙ্গি তামিম সহযোগীসহ নিহত হয়।

কথা হয় বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন দেওয়ানের সঙ্গে। তিনি তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটটি খুলে ঘুরে ঘুরে দেখান। দরজার ওপরের দেয়ালে বেশ কয়েকটি গুলির চিহ্ন। নুরুদ্দিন দেওয়ান বলেন, ‘দরজায় অসংখ্য গুলির চিহ্ন ছিল। পরে সেগুলো ঢেকে দিয়েছি। তারপরও কয়েকটি গুলির চিহ্ন রয়ে গেছে।’

জঙ্গি নিহতের ঘটনার পর তার এবং তার পরিবার সম্পর্কে এলাকাবাসীর এক ধরনের বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়। যেটি পরিবর্তন হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। বাড়িটি নিয়ে এলাকায় যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনও রয়েছে।

ঘটনার দেড় বছর পর পুলিশ বাড়ির চাবি ফিরিয়ে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাঝে-মাঝে টু-লেট লেখা দেখে ভাড়াটিয়া আসেন। কিন্তু, যখন ওই ঘটনা জানতে পারেন; কথাবর্তা বলে গিয়েও আর আসে না।’

নুরুদ্দিন দেওয়ানের ছোট ছেলে দিহান দেওয়ান (৯)। ঘটনার দিন প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। বাড়ির ছাদে কথা হয় সেই দিহানের সঙ্গে। আড়াই বছর আগে তার বয়স ছিল সাড়ে ৬ বছর। সে জানায়, সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনও তার ভয় লাগে। চারদিকে গুলি আর বড় বড় বোমার শব্দ সে শুনেছিল সেদিন।

ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া সুফিয়া বেগম জানান, ২২ বছর ধরে এই বাড়িতে ভাড়া থাকি। কিন্তু এমন ঘটনা আর দেখিনি। বাড়ির মালিক অনেক ভালো। 

ওই বাড়ির আরেক ভাড়াটিয়া রেহানা বেগম বলেন, ‘ঘটনার পর  দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু সেদিনের সেই লোমহর্ষক ঘটনার কথা মনে করতে গিয়ে এখনও শিউরে উঠি। ঘটনার দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমাদের ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। ২৪ ঘণ্টা ঘর থেকে বের হতে পারিনি। ওই সময় বৃষ্টির মতো গুলির শব্দ পেয়েছি। ছোট ছোট নাতি-নাতনিকে নিয়ে আল্লাহকে ডেকেছি আর কান্নাকাটি করে সময় কাটিয়েছি।’

বাড়ির মালিক নুরুদ্দিন দেওয়ান জানান, ওই ঘটনার পর থেকে এলাকার মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার আগে ভোটার আইডি কার্ড নেয়। তা আসল না নকল, তা যাচাই-বাছাই করে ভাড়াটিয়া সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

নুরুদ্দিন দেওয়ান বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘দেড় মাস জেল খেটেছি, দুঃখ নেই। নিজের ক্ষতি হলেও একজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি নিহত হয়েছে, এটা ভেবেই আমি খুশি। দেশ জঙ্গিমুক্ত হোক এটাই চাই।’

তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার পর ভয়ে আতঙ্কে নিচতলার দুটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া চলে গিয়েছিল।’  

নুরুদ্দিন দেওয়ান জানান, ওই ঘটনার পর সামাজিক, পারিবারিক ও আর্থিকভাবে তিনি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ঘটনার পর গোয়েন্দা পুলিশ তাকেসহ পরিবারের সব সদস্যকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দিলেও তাকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয়।

নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া বড় কবরস্থান এলাকার ওই বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খবরে ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট অভিযান চালালে তিন জঙ্গি নিহত হয়। তাদের মধ্যে নিহত হয় গুলশানে জঙ্গি হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীও। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি শাখা যৌথভাবে ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’ নামে এই অভিযানটি চালায়। এর আগে তামিম চৌধুরীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশ ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।