গত বছরের ৬ এপ্রিল দুপুরের দিকে বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় পল্লি বিদ্যুতের ছিড়ে পড়া তারে জড়িয়ে গুরুতর আহত হয় নড়িয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র সিয়াম খান (১৭)। পরে দুই হাতে সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় ঢাকা মেডিক্যালের চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে কবজির ওপর থেকে হাত দুটি কেটে ফেলেন। দুই হাত হারালেও ভেঙে পড়েনি সিয়াম। লেখাপড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকায় দুর্ঘটনার এক বছরের মাথায় দুই হাত ছাড়াই এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে সে।
সরেজমিনে জানা যায়, নড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সিয়াম। কর্তৃপক্ষ সিয়ামের লেখার জন্য একজন ‘রাইটার’ দিয়েছে, সিয়ামের হয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখছে ওই সে।
জানা যায়, ভালোভাবে পড়ালেখা শেষ করে ভবিষ্যতে বিসিএস ক্যাডার হতে চায় সিয়াম।
এ ব্যাপারে সিয়াম বলেন, ‘দুই হাত কেটে ফেলার পর প্রথম প্রথম অনেক হীনমন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু এখন সব কাটিয়ে উঠেছি। আমি সারাজীবন কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না, তাই যত কষ্টই হোক লেখাপড়া বন্ধ করবো না।’
নড়িয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবদুল খালেক বলেন, ‘সিয়াম মেধাবী ছাত্র, পড়াশোনায় তার প্রচণ্ড আগ্রহ রয়েছে। ফলে কলেজ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।’
সিয়ামের পরিবার সূত্রে জানা যায়, পল্লি বিদ্যুতের ভুলে সিয়ামের জীবনে এত বড় বিপর্যয় নামলেও দুঃসময়ে পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে পাশে পাননি তারা। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ৪ জুলাই উচ্চ আদালত সিয়ামের পরিবারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে ৩০ দিনের সময় বেঁধে দিলেও আজ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পায়নি সিয়ামের পরিবার। তখন উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আপিল করেছে, দীর্ঘ ৮ মাসেও যার কোনও নিষ্পত্তি হয়নি।
এ ব্যাপারে সিয়াম খানের বাবা ফারুক আহাম্মেদ খান বলেন, ‘পল্লি বিদ্যুতের একটি ভুলের কারণে আজ আমার ছেলের দুই হাত নেই। আমি গরিব মানুষ, তবুও ধার-দেনা করে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা ছেলের চিকিৎসায় খরচ করেছি। উচ্চ আদালত পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বললেও আমরা কোনও টাকা পাইনি।’
এ বিষয়ে শরীয়তপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহা ব্যবস্থাপক মো. সোহরাব আলী বিশ্বাস বলেন, ‘যখন দুর্ঘটনাটি ঘটে, তখন বিষয়টি নিয়ে আমরা সিয়ামের পরিবারকে চিঠি দিয়েছিলাম। এমনকি দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণও দিতে চেয়েছিলাম। সিয়ামের পরিবার তখন ঢাকায় সিয়ামের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাই আমরা তখন কোনও সহায়তা করতে পারিনি। পরে উচ্চ আদালত পল্লি বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশের পর আপিল করা হয়। তাই আদালতের নির্দেশ ছাড়া আমরা সিয়ামের জন্য কিছুই করতে পারছি না।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল বিকালে নড়িয়ার বিঝারী গ্রামে ঝড়ে পল্লি বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের একটি তার মাটিতে পড়ে যায়। স্থানীয়রা শরীয়তপুর পল্লি বিদ্যুৎ সমিতিতে বিষয়টি মোবাইল ফোনে জানালেও তারা সঞ্চালন লাইন মেরামত না করেই ৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার লাইনটি চালু করেন। সেদিন দুপুরে বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের ছেড়া তারে জড়িয়ে গুরুতর আহত হয় সিয়াম। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা সিয়ামের দুটি হাতই কবজির ওপর থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হন। পাশাপাশি মেরুদণ্ডসহ সিয়ামের শরীরের বিভিন্ন স্থানেও অস্ত্রোপচার করতে হয়।