নীলফামারীতে কালবৈশাখী ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ হাজার পরিবার

নীলফামারী

নীলফামারীর ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলায় বৃহস্পতিবার রাতের কালবৈশাখীর ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার। এছাড়াও ঘরবাড়ি বিধ্বস্তসহ ১৭ হাজার পাঁচশ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে প্রায় ৯৬ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ বিহীন রয়েছে। শনিবার (১২ মে) বিকাল পর্যন্ত এসব এলাকায় কোন ত্রাণ পৌঁছেনি। ডোমার ও ডিমলা উপজেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আফতাব উদ্দিন সরকার, শনিবার দুপুরে জেলার ডোমার উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে দূর্যোগ পরবর্তী মত বিনিময় সভা ও সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই দাবি জানান।

ডোমার পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী সাইমুল হক জানান, বৃহস্পতিবারের ঝড়ে ডোমার ও ডিমলা উপজেলায় ১১ কেভির একশত কিলোমিটার লাইনে ২২টি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ বিহীন আছেন। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরো দুই থেকে তিন সময় লাগবে।
অপরদিকে, পল্লী বিদ্যুতের উপ মহাব্যবস্থাপক মো. আলম হোসেন জানান, ডোমার ডিমলায় এক হাজার ৩৫২ কিলোমিটার লাইনে নয়টি পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৫৩ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর মধ্যে ৫০০ কিলোমিটার মেরামত করে প্রায় পাঁচ হাজার গ্রাহকের সংযোগ চালু করা সম্ভব হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র জানায়, ওই ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ওই তিন উপজেলার ২২টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার পাঁচ শত হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ হাজার ৩৬ হেক্টর। এর মধ্যে বেরো ক্ষেত নয় হাজার ২৯৮ হেক্টর, আউশ ৫১ হেক্টর, পাট এক হাজার ৮৩৬ হেক্টর,বাদাম ১২০ হেক্টর, ভুট্টা ৪৮৮ হেক্টর, মরিচ ২৩ হেক্টর, সবজি ২১৭ এক্টর এবং মুগডাল তিন হেক্টর।

নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আফতাব উদ্দিন সরকার দাবি করে বলেন, ‘আমার জীবনে এমন ঝড়-শিলাবৃষ্টি দেখিনি। ওই ঝড়ে ডোমার উপজেলার নয়টি এবং ডিমলা উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের কৃষক ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিভাবে ওই ক্ষতির মোকাবেলা করবেন সে পথ খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। বিষয়টি সরকারের উচ্চ মহলে তুলে ধরা জরুরি। এ এক্ষেত্রে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংবাদ মাধ্যমের ভ’মিকা অপরিসিম।’

তিনি দাবি করেন,‘দুর্যোগে গরিব-ধনী, ছোট-বড় কৃষক সকলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কৃষক ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ ও বাকিতে সার বীজ, কীটনাশক কিনে সেচ নির্ভর বোরো ধান আবাদ করেছেন। এ অবস্থায় ঋণ পরিশোধ দুরের কথা সেচ পাম্পের বিদ্যুৎ বিলও পরিশোধের সামর্থ নেই তাদের।’
তিনি বলেন,‘এনজিও, ব্যাংক এবং বিদ্যুৎ বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যাতে পরবর্তি ফসল না উঠা পর্যন্ত কিস্তি স্থগিত রাখেন এবং বিদ্যুৎ বিভাগ বিলের জন্য তাদের চাপ সৃষ্টি না করেন সে বিষয়টি এখন নিশ্চিত করা জরুরি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ডোমার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বসুনিয়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা, ডোমার উপজেলার সকল ইউনিয়ন পরিষদের সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম কর্মীরা।

অপরদিকে নীলফামারী-৩ (জলঢাকা-কিশোরগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা গত বৃহস্পতিবারের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে জলঢাকা ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘গত দুইদিন ধরে আমার নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শণ করে যা দেখেছি, যে পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করা সম্ভব না। মানুষ দাদন করে, এনজিও ঋণ করে সার বীজ কীটনাশক বাকিতে নিয়ে ফসল ফলিয়েছিল। দুই একদিনের মধ্যে তাদের ফসল ঘরে ওঠার কথা ছিল। এমন ঝড় এ অঞ্চলের মানুষ এর আগে দেখেনি। তিনি জানান, ত্রাণ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে কথা হয়েছে। খুব শিঘ্রই সরকারি সহযোগিতা দেওয়া সম্বব হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক আবুল কাশেম আযাদ বলেন,‘ কৃষিতে ক্ষতির পরিমান প্রাথমিকভাবে নিরুপন করে আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী করণীয় বিষয়গুলোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। নিহত সাত জনের প্রত্যেক পরিবারকে তাৎক্ষনিক নগদ ১৫হাজার টাকা এবং ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে শুরু হওয়া ওই কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে গাছ ও ঘর ভেঙ্গে পড়ে ডোমার ও জলঢাকা উপজেলায় মা-মেয়েসহ সাত জন নিহত হন, তিন উপজেলায় আহত হয় কমপক্ষে ৫০ ব্যক্তি।