ভয়ে জামিন নিচ্ছে না ‘বন্দি’ মাদক ব্যবসায়ীরা



সিলেটের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শহীদসহ তার সহযোগীরা, সবার মধ্যখানে আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী শহীদ ও বাম দিকে তার স্ত্রী বুলুআইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে সিলেটের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে রয়েছে। আবার ‘বন্দুকযুদ্ধ’ আতঙ্কে কারাগারে বন্দি থাকা অনেক মাদক ব্যবসায়ী জামিনের জন্য আবেদন করছে না। অথচ অভিযান শুরুর আগে তারা একাধিকবার জামিন আবেদন করেছিল। আদালত ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কারাগারে মাদক বিক্রির অভিযোগে গ্রেফতার থাকা দুই ব্যক্তির পক্ষে আদালতে দাঁড়ানো নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আইনজীবী বলেন,‘‘সম্প্রতি ব্যবসায়ীদের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে কারাগারে থাকা আমার দুজন মক্কেল জামিনের জন্য আবেদন করছেন না। তারা আমাকে আদালতে জামিন শুনানি না করার জন্য বলেছেন । অথচ দেড়মাস আগে তারা অন্তত ছয়বার আদালতে জামিন শুনানির জন্য আবেদন করেন।’’

সিলেট চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের সহকারী কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান জানান, মাদক মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হওয়াতে কারাগারে থাকা মাদক মামলার আসামিরা জামিন শুনানিতে খুবই কম অংশ নিচ্ছে। কারাগারে থাকা মাদক মামলার আসামিরা মনে করছে জেলের ভেতরেই তারা নিরাপদ।

তিনি আরও বলেন, কারাগারে থাকা মাদক মামলার আসামিদের মধ্যে ভয় থাকার কারণেই তারা জামিন নিয়ে বের হতে চাচ্ছে না।  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ অভিযান অব্যাহত থাকলে মাদক সেবন ও বিক্রি অনেকটাই কমে যাবে। 

সিলেটের বিশেষ দায়রা জজ (জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল) আদালতের বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট নওশাদ আহমদ চৌধুরী বলেন,‘মাদকের মামলা আদালতে চলছে এবং যথাসময়ে রায়ও হচ্ছে। মামলার সাক্ষ্য নেওয়ার সময় শুরু হলে মামলার গতিও কমে যায়। কারণ যথাসময়ে আদালতে সাক্ষিদের হাজির না করতে পারা। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদেরকে আরও কঠোর হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই মাদক মামলা থেকে বাঁচার জন্য নানা ধরনের অসদুপায় অবলম্বন করে যাচ্ছেন। আসলে এই মনোভাব থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে এসে দেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে হবে।’

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব (গণমাধ্যম) বলেন,  ‘সিলেটে মাদক নিয়ন্ত্রণে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের এজেন্টদেরকে গ্রেফতার করে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। কারাগার থেকে কেউ জামিনে মুক্তি পাচ্ছে কিনা সে বিষয়টিও পুলিশ নজরে রেখে কাজ করে যাচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘সিলেটের আলোচিত মাদক ব্যবসায়ী দক্ষিণ সুরমার তেলীবাজারের দুলাল মিয়ার ছেলে শহীদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শিউলি আক্তারসহ অন্য সহযোগীরা ইতোমধ্যে জামিন নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। সিলেটের মাদক আস্তানাগুলো বন্ধ থাকায় এরা ছাড়াও আলোচিত অনেকে গা ঢাকা দিয়েছে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সিলেট নগর ও আশপাশ এলাকা এবং সীমান্তে একাধিক শক্তিশালী চক্র ইয়াবা, ফেনসিডিল, বিভিন্ন ধরনের মদ, বিয়ার, হেরোইন ও গাঁজার ব্যবসা করে আসছে। সিলেটে ইয়াবা ও হেরোইন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকারীদের মধ্যে অন্যতম শহীদুল ইসলাম শহীদ। সে সস্ত্রীক গ্রেফতারের পর জামিন নিয়ে পালিয়ে বেড়ালেও এখনও তার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা   মোবারক। এছাড়াও ধরাধরপুরের রুহেল, ভার্থখলা এলাকার শাহীন, দক্ষিণ সুরমার সাবিহা, রেবা, রহিম, বেজবাড়ির আনোয়ার, রিমা, শিববাড়ির আশিক, বদিকোনার আলম, কাষ্টঘরের হিরণ দাস ও জুলোন বাবু, দক্ষিণ সুরমার মাছবাজারের মাদকের খুচরা ব্যবসায়ী আলামিন, নজরুল ও সুহেল এর নাম আছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর খাতায় । এদের মধ্যে কয়েকজন কারাগারে থাকলেও অধিকাংশ মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে রয়েছে। এছাড়াও পুলিশ জানিয়েছে, পারুল, বুলু, আবদুল হক, কাশেম, রিপন, শহীদ ও বাবুলসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে দক্ষিণ সুরমার রেলস্টেশন ও চাঁদনীঘাট এলাকায় রয়েছে শক্তিশালী মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট। নতুন  রেলস্টেশন এলাকায় তাজু, জিঞ্জির শাহর মাজার এলাকায় আরিফ নামের এক ব্যবসায়ী মাদক ব্যবসা করে আসছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে মোবাইল ফোনে এদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সবার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

সিলেট র‌্যাব-৯ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিদিন র‌্যাব মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীদেরকে গ্রেফতার করছে। এমনকি সম্প্রতি র‌্যাব সিলেটে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাদকসেবীদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থ ও কারাদণ্ড দিচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার র‌্যাব ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সিলেটে ২৫ মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছে। আমাদের কার্যক্রমে সিলেটে মাদকসেবীদের আনাগোনা অনেকটাই কমে গেছে।’

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার আবু সায়েম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের করণে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারাগারে ১৭০ জন পুরুষ ও তিনজন মহিলা কয়েদি রয়েছে, যারা মাদক মামলার আসামি। এছাড়াও হাজতি পুরুষ ২৫০ ও নারী রয়েছেন তিনজন। কারাগারে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের। যাতে তারা কারাগারের ভেতরে মাদক কেনা-বেচা করতে না পারে।’

সূত্র জানায়,সিলেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে প্রতিদিনই চোরাচালানের মাধ্যমে মাদক প্রবেশ করছে। সীমান্তের এসব পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিল, বিয়ার, হুইস্কি, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য এলেও এসবের সঙ্গে জড়িত চোরাকারবারিদের রুখতে পারছে না সীমান্তরক্ষী বাহিনী। যদিও বিজিবি প্রায়ই  সীমান্ত এলাকা থেকে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য জব্দ করছে। গতবছর সিলেটের চার জেলায় অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ১২ কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে বিজিবি। পরে তা ধ্বংস করা হয়। ওই এক বছরে আটক করা হয় ১৮০ জন। সিলেটের বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাগুলো ভারতের সীমান্তঘেঁষা। এ ছাড়া কানাইঘাট উপজেলার সুরইহাট ও  ডোনা সীমান্ত, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উৎমা, কালাইরাগ, বড়পুঞ্জি ও ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলার তামাবিল এলাকার বিছনাকান্দি, লামাপুঞ্জি, দমদম সীমান্ত এলাকা এবং বিয়ানীবাজারের সীমান্ত এলাকার গজুকাটা ও নয়াগ্রাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক আসে।

তবে সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুল আলম (গণমাধ্যম) বলেন, ‘সীমান্ত এলাকার থানাগুলোতে মাদক ব্যবসায়ীদেরকে গ্রেফতার করার জন্য সবসময়ই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সর্তক থাকার জন্য থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া আছে। কেউ দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’