ইউপিডিএফের দুই গ্রুপের কোন্দলে তিন সপ্তাহ থেকে অচল পানছড়ি বাজার

ক্রেতা নেই পানছড়ি বাজারে

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর দুই অংশের বিরোধের কারণে তিন সপ্তাহ ধরে বন্ধ হয়ে আছে জেলার পানছড়ি উপজেলার সবচেয়ে বড় বাজারটি। ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর কোন্দলের কারণে বাজারে সাধারণ পাহাড়িদের আসতে বাধা দিচ্ছে প্রসিত গ্রুপের সদস্যরা। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন পানছড়ি বাজারের ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি সমাধানে একাধিক সভা হলেও কোনও সুফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিন ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২০ মে থেকে বাজার বর্জন কর্মসূচি চলছে। ইউপিডিএফের (প্রসিত গ্রুপের) নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হুমকির কারণে অচল হয়ে পড়েছে শত বছরের পুরাতন এই বাজার। বিপাকে পড়েছেন বাজারের পাঁচ শতাধিক স্থায়ী ব্যবসায়ীর পাশাপাশি আরও তিন থেকে চারশ’ অস্থায়ী ব্যবসায়ী।

একাধিক পাহাড়ি ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জমিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করে তাদের পরিবার, সন্তানের লেখাপড়া  ও চিকিৎসা চলে। বাজার বর্জনের কারণে তারা দুর্ভোগে পড়েছেন। যারা বাজার বর্জনের ডাক দিয়েছেন, তারা নিজেদের স্বার্থেই ডাক দিয়েছেন উল্লেখ করে তারা আরও বলেন, ‘তারা ফোন করলে ট্রাকে ট্রাকে পণ্য পৌঁছে যায় ঘরে, কিন্তু আমাদের মতো খেটে খাওয়া লোকজনের সেই সুবিধা নেই।’ দ্রুত বাজার চালুর দাবি জানান তারা।

ইউপিডিএফ (প্রসিত) সমর্থিত পানছড়ি বাজার বর্জন কমিটির সভাপতি সুশান্ত চাকমা অভিযোগ করে বলেন, ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (এমএন লারমা) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বাজারের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছে। প্রশাসন তথাকথিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) অংশের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়ে মূল ইউপিডিএফের বিরূদ্ধে অপহরণ, খুন ও গুমের অভিযোগ আনছে। প্রশাসনের বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে পাহাড়ি জনসাধারণ নিজ থেকে পানছড়ি বাজার বয়কট করছে। পানছড়ি বাজার সন্ত্রাসীমুক্ত ও নিরাপদ হলেই বাজারে যাবে পাহাড়ি জনসাধারণ।’

ক্রেতা নেই পানছড়ি বাজারে

তবে ইউপিডিএফ-এর এই অভিযোগ সঠিক নয় উল্লেখ করে পানছড়ি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হেদায়েত তালুকদার বলেন, ‘গত ২০ মে থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ পাহাড়িরা ভয়ে বাজারে না আসায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও বাজার সংশ্লিষ্টরা। পাহাড়ে উৎপাদিত চলমান সময়ের ফলমূল ও ফসলাদি বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতে না পারায় পানছড়ি বাজারে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। লাগাতার বাজার বর্জনের প্রভাব পড়ছে জনজীবনে।’

এ প্রসঙ্গে হেদায়েত তালুকদার আরও বলেন, ‘ইউপিডিএফ-এর দুটি অংশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পানছড়ি বাজারের এই অচলাবস্থা।’

পানছড়ি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, ‘সাধারণ পাহাড়িদের ভয়ভীতি দেখিয়ে পানছড়ি বাজার আসতে বাধা দিচ্ছে সন্ত্রাসীরা। গত ২০ মে থেকে হাট-বাজারে সাধারণ পাহাড়িদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। এতে ব্যবসায়ী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বিপাকে পড়েছেন।’ দীর্ঘদিনেও সমস্যার সমাধান না হওয়ার জন্য প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন তিনি।

ক্রেতা নেই পানছড়ি বাজারে

এ ব্যাপারে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. বাহার মিয়া বলেন, ‘পানছড়ি উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক গ্রামের মানুষের কেনাকাটার একমাত্র স্থান পানছড়ি বাজার। বাজারের প্রায় প্রত্যেক ব্যবসায়ী সিসি লোন নিয়ে ব্যবসা করছে। দুয়েকজন ছাড়া এখানে কেউ কোটিপতি না। প্রতি সপ্তাহের রবিবারে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোকজন কেনাকাটা করতে আসতো এবং প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ হাজার লোকের সমাগম হতো। গত ১৯ দিন বাজারে মানুষ নেই বললেই চলে। বাজার বর্জনের ফলে গত ১৯ দিনে কমপক্ষে একশ’ কোটি টাকার লেনদেন ব্যাহত হয়েছে।’ বাজারের ওপর হাজার হাজার পরিবারের নির্ভরতা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘চলমান বাজার বর্জন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাশেম বলেন, ‘একটি অমূলক, ভ্রান্ত ও ত্রুটিযুক্ত ধারণার ওপর শত বছরের পুরাতন বাজার বর্জন হীনমন্যতার আরেকটি রূপ। বাজার বর্জনের ফলে শুধু বাঙালি লোকজন নয়, পাহাড়িরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইতোপূর্বে বিভিন্ন শ্রেণির লোকজনের সঙ্গে একাধিকবার বসেছি এবং কথা বলেছি।’ সবার অংশগ্রহণে দ্রুত পানছড়ি বাজারের অচলাবস্থা দূর হবে বলে আশা করেন তিনি।