হালিশহরে পানির কারণেই হেপাটাইটিস-ই’র প্রাদুর্ভাব!

পানি (ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)ওয়াসার পানিতে দূষণ, দীর্ঘদিন ধরে ওভারহেড ট্যাংকগুলো অপরিষ্কার থাকার কারণে পানি দূষণ এবং জলাবদ্ধতার পানিতে মলমূত্রের মিশ্রণে দূষণ- এই তিন মাধ্যমের যে কোনও একটি মাধ্যমে দূষিত অনিরাপদ পানি পান করার কারণেই চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় হেপাটাইটিস-ই’র প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে তাদের সামনে এই কারণটিই ঘুরে ফিরে আসছে। চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন, পানি দূষণের এই মাধ্যমগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে হালিশহর এলাকায় রোগটি মহামারি আকার ধারণ করবে।

সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হেপাটাইটিস-ই একটি পানিবাহিত রোগ। অনিরাপদ পানি পান করলে অথবা বাসি বা ময়লাযুক্ত খাবার খেলে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। হালিশহর এলাকায় আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখেছি, সেখানে পানি দূষণের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানির দূষণটা বিভিন্ন দিক থেকে হতে পারে। ওয়াসার পানি দূষণের কারণেও হতে পারে। মে মাসের শুরুর দিকে যখন হালিশহর এলাকায় হেপাটাইটিস-ই’র প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (আইইডিসিআর) প্রতিষ্ঠানের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এসে আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনা ও ওই এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ওয়াসার পানির নমুনা সংগ্রহ করেন। ঢাকায় ল্যাবে পরীক্ষা করার পর রক্তে হেপাটাইটিস-ই’র লক্ষণ পাওয়া যায়। আর ওয়াসার পানি পরীক্ষা করার পর দুয়েকটি নমুনায় সমস্যা পাওয়া গেছে।’চট্টগ্রামের হালিশহরে তিন জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে হেপাটাইটিস ই উল্লেখ করা হয়

আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ওই এলাকায় অনেক ওভারহেড পানির ট্যাংক আছে যেগুলো অনেক বছর ধরে পরিষ্কার করা হচ্ছে না। ওই ট্যাংকগুলোর পানিতেও জীবাণু থাকতে পারে। এছাড়া একটু বৃষ্টি হলেই হালিশহর এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এসময় টয়লেটের পানি আর খাবার পানি একাকার হয়ে যায়। ওই পানি পান করলেও হেপাটাইটিস-ই হতে পারে। তাই এই রোগটি মহামারি রূপ না নেওয়ার আগেই আমাদের এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।’ তিনি হালিশহর এলাকার বাসিন্দাদের পানি ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

সম্প্রতি হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়ে ওই এলাকার দুই বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে। এদের একজন হলেন ইয়াছির আরাফাত, অন্যজন শাহেদা মিলি। ইয়াছির আরাফাত গত ২২ জুন সকাল পৌনে ৬টায় বিআরবি হসপিটাল লিমিটেড-এ ভর্তি হন। দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৪ জুন রাত সোয়া ১টার দিকে তিনি মারা যান। অপর দিকে শাহেদা মিলি গত ১৭ জুন দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ওই দিনেই তার মৃত্যু হয়। তবে এ দু’জন ছাড়াও আরও একজন হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে জেলা সিভিল সার্জন।

মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়ে এক নারীসহ তিনজন মারা যাওয়ার ঘটনায় বুধবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিভিল সার্জন অফিস। সংবাদ সম্মেলনে হালিশহর এলাকায় হেপাটাইটিস-ই রোধে করণীয় নিয়ে অবহিত করা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনে সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী তিনজন মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এসময় গত দেড় মাসে ১৭৮জন হেপাটাইটিস-ই আক্রান্ত রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে তিনি জানান।

তবে বাংলাদেশ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা (আইইডিসিআর) প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দলের সদস্য ডাক্তার আবদুল্লাহিল মারুফ ফারুকী বলেছেন, ‘হালিশহর এলাকায় এর চেয়েও বেশি মানুষ হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।’ বুধবার সন্ধ্যায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে ১৭৮ জন হেপাটাইটিস-ই আক্রান্ত রোগী সেবা নিয়েছেন। আমাদের ধারণা, সাম্প্রতিক এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আরও অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি হবে।’ তবে বিপুল পরিমাণ এই মানুষ কেন হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়েছেন তার কোনও সঠিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।

আব্দুল্লাহিল মারুফ ফারুকী বলেন, ‘অনিরাপদ পানি পান ও দূষিত খাবারের কারণে মানুষ হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হয়। হালিশহর এলাকায় মানুষ ঠিক কী কারণে হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হচ্ছেন আমরা নিশ্চিত নই। আমরা হালিশহর এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টের খাবার পানি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলো ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখবো। এরপরই জানা যাবে কী কারণে হালিশহর এলাকায় মানুষ হেপাটাইটিস-ই তে আক্রান্ত হচ্ছে।’

এর আগে মে মাসে মাঝামাঝিতে প্রথম পানির নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর’র একটি প্রতিনিধি দল। ওই প্রতিনিধি দলে আব্দুল্লাহহিল মারুফ ফারুকীও ছিলেন। সংগ্রহ করা ওই পানিতে জীবাণু পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে জানতে তিনি আইইডিসিআর’র ইনফরমেশন সেলের দায়িত্ব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা পরামর্শ দেন।

সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার সেলিম আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘জন্ডিস আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় আতঙ্কিত বা ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। এটা একটি পানিবাহিত রোগ। এই রোগ থেকে বাঁচতে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’

এসময় ওয়াসার পানিতে দূষণ পাওয়ার বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান। সেলিম আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘ওয়াসার পানিতে দূষণা পাওয়া গিয়েছে কিনা আমরা নিশ্চিত নই। কারণ ওই এলাকা থেকে সংগ্রহ করা পানি পরীক্ষার পর প্রতিবেদন আমরা পাইনি। ওয়াসার পানিতে দূষণ আছে কিনা সেটা ওয়াসা কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। আইইডিসিআর থেকে পাঠানো পানি পরীক্ষার প্রতিবেদনটি তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।’

এ সর্ম্পকে জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে এম ফজলুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের (ওয়াসার) পানিতে কোনও দূষণ পাওয়া যায়নি। আইইডিসিআর থেকে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল পানিতে দূষণ নেই। শুধু একটি নমুনায় আরোবিক প্লেইন কাউন্ড (এপিসি) ১১শ’র মতো পাওয়া গেছে। যেখানে নরমাললি এটি  এক হাজারের নিচে থাকার কথা।’

তিনি বলেন, ‘এপিসি বাড়ার কারণে হেপাটাইটিস-ই হয় না। তারপরও এটি কেন বেশি পাওয়া গেছে আমরা তার কারণ বের করার চেষ্টা করছি।’

একে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘সিভিল সার্জন কীভাবে জানলেন ওয়াসার পানিতে জীবাণু রয়েছে? আমরা নিজেরাই ওয়াসার পানির স্যাম্পল বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়েছে। তারা সেখানে কোনও সমস্যা পাননি। আইইডিসিআর’র প্রতিবেদনেও দূষণের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরপরেও সিভিল সার্জনের এরকম মন্তব্য আমরা বিস্মিত। একজন সরকারি আমলা হয়ে তিনি কীভাবে এরকম মন্তব্য করেন আমার বোঝে আসে না।’

আরও পড়ুন- 

হেপাটাইটিস ই’র ঝুঁকি কমাতে পারে সচেতনতা

হালিশহরে আবারও জন্ডিসের প্রকোপ, দুইজনের মৃত্যু