বাঁশবাড়িয়া সৈকতে প্রাণহানি বাড়ছে যে কারণে

সৈকতচট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া সৈকতটি ক্রমেই যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে। এই সৈকতে গোসল করতে গিয়ে প্রায়ই সমুদ্রে নিখোঁজ হচ্ছেন পর্যটকরা। পরে বেশিরভাগেরই লাশ মিলছে। সর্বশেষ শুক্রবার (৬ জুলাই) বিকালে ওই সৈকতে গোসল করতে গিয়ে তিন শিক্ষার্থী নিখোঁজ হয়েছেন। এর আগে গত ২১ জুন ওই সৈকতে গোসল করতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে মারা গেছেন দুই শিক্ষার্থী। স্থানীয়রা বলছেন, সৈকতে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা কোনও কাজে আসছে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই ওই সৈকতে ভিড় করছেন পর্যটকরা। নিজেদের খামখেয়ালির কারণে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা।

বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু দিন আগে দুই শিক্ষার্থী সমুদ্রে ডুবে মারা যাওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র এলাকায় পানিতে না নামার জন্য সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়। সমুদ্রে লাল পতাকা দিয়ে সর্তক করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যটকরা প্রশাসনের এসব নিষেধাজ্ঞা মানছেন না। বার বার নিষেধ করার পরও তারা সমুদ্রে নামছেন। এ কারণেই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সৈকতে দুপুরের পর থেকে গ্রাম পুলিশরা দায়িত্ব পালন করেন। তারা সৈকতে না নামতে পর্যটকদের বুঝিয়ে বলেন। কিন্তু পর্যটকরা তাদের অনুরোধ না মেনে উল্টো সাঁতার জানেন বলে গ্রাম পুলিশদের ব্যঙ্গ করেন।’ পর্যটকরা সচেতন হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকার রাজা কাশেম নামে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি সরকারি অনুমোদন ছাড়াই অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে বাঁশবাড়িয়া সৈকতকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি বড় বড় সাইনবোর্ড দিয়ে তিনি পর্যটকদের আকৃষ্ট করছিলেন। এই প্রচারণায় পর্যটকরা সেখানে গিয়ে বিপদের মুখে পড়ছেন। সর্বশেষ শুক্রবার (৬ জুলাই) ওই সৈকতে ঘুরতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে তিন তরুণ নিখোঁজ হয়েছেন। তারা হলেন- ইয়াছিন (১৮), আলাউদ্দিন (২০) ও সাইফুল ইসলাম (২৪)। তারা তিনজনই নগরীর ঝাউতলা এলাকায় থাকতেন। 

এর আগে গত ২১ জুন বিকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে বেড়াতে আসা ৯ জন শিক্ষার্থী সৈকতে গোসল করতে নামেন। তাদের মধ্যে ইমন (১৯) ও রাজ (২০) নামে দুই শিক্ষার্থী স্রোতের তোড়ে ভেসে যান। ২৪ ঘণ্টা পর ওই দুই শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তারও আগে গত বছরের ১৬ আগস্ট বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে গুলিয়াখালী সৈকতে বেড়াতে গিয়ে লাশ হয়েছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাকিব মোহাম্মদ খাব্বাব। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে সৈকতে গোসল করতে নামলে সমুদ্রের ঢেউ তাকে টেনে নিয়ে যায়।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২১ জুন সমুদ্রে গোসল করতে নেমে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতটিকে পর্যটকদের সতর্ক করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছি। সমুদ্র সৈকতে গ্রাম পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা সেখানে যেতে পর্যটকদের নিষেধ করেন। কিন্তু এরপরও পর্যটকরা তাদের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে যাচ্ছেন, সমুদ্রে গোসল করতে নেমে পড়ছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজা কাশেম নামে এক লোক জেলা প্রশাসনের কোনও অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র উপকূলকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলে। তার প্রচারণার কারণেই এই সমুদ্র সৈকতটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আমরা তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য থানা পুলিশকে বলেছি। তারা তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।’

এ সম্পর্কে জানতে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পর্যটকরা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমুদ্রে নামছে। আমরা সেখানে চৌকিদার নিয়োগ, সমুদ্রে লাল পতাকা দেওয়াসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কিন্তু এরপরও দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না। পর্যটকরা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই সেখানে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সৈকতটি বাঁশবাড়িয়ার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ছোট এলাকা হলে না হয় আমরা কাঁটাতার দিয়ে বেড়া দিয়ে দিতাম। কিন্তু এত বড় এলাকায় কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়। তারপরও আমরা ভাবছি, কীভাবে সেখানে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ করা যায়। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে আমরা আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’ 

আরও পড়ুন- চট্টগ্রামে সৈকতে গোসল করতে নেমে তিন ছাত্র নিখোঁজ