বাম্পার ফলনের পরও লোকসানে দিশেহারা আম চাষিরা

কানসাট আম বাজারআমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরু থেকেই অব্যাহত দরপতনের মধ্য দিয়ে চলছে আমের কেনা-বেচা। যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। বাজারে ক্রেতা না থাকায় গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে আমের সামগ্রিক উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের এই দরপতন। ব্যাপারীরা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল না থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারাও। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রয়োজন আমের ‘ব্র্যান্ডিং’।কানসাট আম বাজার

এদিকে আম ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এবার আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের ৮’শ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও আম চাষিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটি। অন্যদিকে স্থানীয় জেলা প্রশাসন বলছেন, ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ চলছে। খতিয়ে দেখা হচ্ছে ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও। নেওয়া হচ্ছে আম সংরক্ষণ ও রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ।

দেশের সর্ববৃহৎ আম বাজার ‘কানসাট’। যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে আমের কেনা-বেচা। যা আম মৌসুমে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারনায় মুখরিত থাকে। তবে চলতি মৌসুমে আমের অব্যাহত দরপতনের কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন। বাজারে আমের সরবরাহ থাকলেও নেই কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা। আর ক্রেতা না থাকায় গত বছরের চেয়ে অর্ধেকেরও কমদামে আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এই বাজারদর মণপ্রতি ৮’শ থেকে ১৫’শ টাকা পর্যন্ত কম।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাজারে দেড়মাসেরও বেশি সময় হতে চললো আম উঠেছে। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে গুটি, গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত জাতের আম। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে আম্রপালি, বোম্বাই ক্ষিরসা, ল্যাংড়া ও ফজলি জাতের আম। আর কিছুদিন পরেই বাজার দখল করবে আশ্বিনা জাতের আম। কিন্তু বাজারের মন্দাভাব কিছুতেই কাটছে না।কানসাট আম বাজার

শুক্রবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এদিন কানসাট ও সদরঘাট আম বাজারে ল্যাংড়া আম বিক্রি হয়েছে দুই হাজার থেকে ২২’শ টাকা মণ দরে, বোম্বাই ক্ষিরসা ১৪০০ থেকে ১৬০০টাকা, ফজলি বিক্রি হচ্ছে ৯০০থেকে ১২০০টাকা, আম্রপালি ১৮০০ থেকে ২০০০হাজার, লক্ষণা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০টাকা দরে।

আম ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, ‘গত এক সপ্তাহ থেকে আমের দাম একটু বেড়েছে। আগে আরও কম দামে আম বিক্রি হয়েছে কানসাট আম বাজারে।’ কিন্তু হঠাৎ করেই আমের দাম এত কমে যাওয়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে  চাষি, ব্যবসায়ী, পাইকার সবার একই  উত্তর, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমের উৎপাদন বেড়ে গেছে। একই কারণে আমের দাম কমে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত অখ্যাত আম ঢাকা বা চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম’ বলে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এতেই প্রধানত হুমকির মুখে পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম-বাণিজ্য। আর কম দামে আম পাওয়ায় আমের বড় বড় পাইকাররা এবার অন্য জেলামুখী হয়েছেন।চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার আমের বাম্পার ফলন

শিবগঞ্জের আম চাষি সেনাউল ইসলাম জানান, ‘আমরা অত্যন্ত যত্ন করে আম উৎপাদন করি। যাতে ফলন ভালো হয় এবং আমের গুণগত মান ও স্বাদ ঠিক থাকে। এসব করতে গিয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু অন্য জেলায় আমের উৎপাদন খরচ কম। তাই বাজারে দামের দিক দিয়ে টিকতে পারছে না এ জেলার আম। আবার অন্য জেলার ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের ঠকিয়ে তাদের আমকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে বিক্রি করছেন। এতে ক্রেতারা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি বদনাম হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আরামবাগের আম ব্যবসায়ী তৌহিদুর রহমান জানান, ‘গত এক দশকের মধ্যে আমের দামের এমন বিপর্যয় কখনও হয়নি। ঠিক কী কারণে বাজারে ক্রেতা আসছে না তা তারা বুঝতে পারছি না। আমার ২২ লাখ টাকায় কেনা আমবাগানে শ্রমিক খরচ ও বিষ বাবদ আরও ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েচে। অথচ গত দেড়মাস ধরে মাত্র চার লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি। এ অবস্থা পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’

তৌহিদুর রহমানের মতো একই অবস্থা এবার জেলার শত শত আম চাষি ও ব্যবসায়ীর। কানসাট আম বাজার সরজমিনে এমন বহু আম চাষি ও ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এবার আম চাষ করে তারা পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। অনেকেই দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এখন তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ হবে কীভাবে তারা তা নিজেও জানেন না। অন্যদিকে, বিষের দোকানদাররা বকেয়া টাকার জন্য এখন চাপ দিচ্ছেন আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার আমের বাম্পার ফলন

কানসাট এলাকার আম বাগান মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে অব্যাহত আমের দরপতন ঘটছে। চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ দরপতন দেখা দিয়েছে। আগে যে আম বাগান আমি সাড়ে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি, এবার তা বিক্রি করেছি ৩ লাখ টাকায়।’ তিনি জানান, সামগ্রিকভাবে আমের উৎপাদন বাড়ছে। এতে দিন দিন কমে যাচ্ছে আমের দাম। এ অবস্থায় আমরা নিজেরা যেমন দিশেহারা হয়ে পড়ছি, আগামীতে আমের ভবিষৎও অন্ধকার দেখছি।’ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই আম বাগান মালিক জানান, ‘আম শিল্পকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে এ অবস্থা চলতে থাকলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম নির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের  বিপর্যয় নামবে।’

কানসাট বাজারে কথা হয় ফরিদপুরের ব্যাপারী ফরহাদ মোল্লার সঙ্গে। গত ১৫ বছর ধরে কানসাট বাজার থেকে আম কিনে ফরিদপুর, ঢাকা, ও মাদারীপুরে বিক্রি করেন তিনি। এই ব্যবসায়ী জানান, ‘আমার ব্যবসায়িক জীবনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের এত কম দাম দেখিনি। তবে আমের দাম কম হলেও আম কিনে লাভবান হচ্ছি না আমরাও। বাজার স্থিতিশীল না থাকায় আমরাও লোকসানের মুখে পড়েছি এবার। ছোট ছোট খুচরা ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আম নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন অলি-গলিতে ভ্যানে করে অল্পদামে আম বিক্রি করায় আমরা আড়তদাররা পড়ছি লোকসানের মুখে। এ কারণে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমরাও ব্যাপকহারে আম কিনতে ভয় পাচ্ছি।’

কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. কাজী এমদাদুল হক জানান, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের উৎপাদিত আমের স্বাদ ভালো হওয়ায় ক্রেতারা একটু বেশি দাম হলেও তা কিনতে চান। কিন্তু ক্রেতাদের কাছে যে আমটি যাচ্ছে সেটি যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম তার নিশ্চয়তা কী? তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ‘ব্র্যান্ডিং’ জরুরি হয়ে উঠেছে। এ জেলার কোন আম কখন পাকে এবং বাজারে পাওয়া যায় তার ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় বাজারগুলোয়। যাতে অন্য জেলার আম চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হিসেবে কেউ বিক্রি করতে না পারে। এ জেলার আম কেবল এ জেলার আম হিসেবেই বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চলে। আর এটা নিশ্চিত করতে পারলেই আমের দরপতন ঠেকানো সম্ভব।’

বাংলাদেশ ম্যাংগো প্রডিউসার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ জানান, ‘চলতি মৌসুমে আমের দাম কম হওয়ায় এখন পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী ও ব্যবসায়ীদের প্রায় ৮’শ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ও চাষী পুঁজি হারিয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থায় আমের ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ারও দাবি জানাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমের সামগ্রিক উৎপাদন বেড়ে যাওয়া ও আমের বাম্পার ফলনই শুধু আমের দাম কমার পেছনে একমাত্র কারণ নয়, জলবায়ুর প্রভাবও এখানে অনেকাংশে দায়ী। এ বছর আম পাকার মৌসুমে টানা খরা এবং তাপমাত্রা প্রচণ্ড বেড়ে যাওয়ায় একসঙ্গে আগাম জাতের আম পেকে যায়। আর ঈদের আগে পরে দুই সপ্তাহ পরিবহন বন্ধ থাকায় (ট্রাক ও কুরিয়ার সার্ভিসগুলো) এই পাকা আম বাজারজাত করতে না পারায় এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে কম মূল্যে আম বিক্রি করতে বাধ্য হয়।’ আর এই বৈরি আবহাওয়াকে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বলে দাবি করছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।কানসাট আম বাজার

এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উৎপাদিত আমের নায্যমূল্য নিশ্চিত ও বাজার সৃষ্টিতে ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, এ বছর আম চাষীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখানকার উৎপাদিত আমের খ্যাতি দেশজুড়েই। শুধু তাই নয়, বিদেশেও  এ জেলার আমের সুনাম রয়েছে। জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। শিগগরিই এর সুবিধা পাবেন চাঁপাইনবাবগঞ্জবাসী। তিনি বলেন, 'ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে এবার বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করা হয় তিন দিনব্যাপী (২৯ জুন থেকে ১ জুলাই) চাঁপাই ম্যাংগো ফেস্ট-২০১৮। এই ফেস্টের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আমের পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের দৃষ্টি আর্কষণ করা। যাতে তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের গুণাবলী সম্পর্কে জানতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘এই জেলার আমের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য ক্রেতাদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলেই দেশের বিভিন্নস্থানে এ জেলার আমের চাহিদা বেড়ে যাবে। আর চাহিদা সৃষ্টি হলেই চাষিরা পর্যাপ্ত দামও পাবেন।’

তিনি আরো জানান, ম্যাংগো ফেস্টের ফলে আম কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আনা-গোনা বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আম-বাণিজ্যে। এছাড়া সদ্য শেষ হওয়া ম্যাংগো ফেস্টে কৃষিবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের এক সেমিনারে আম সংরক্ষণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মঞ্জুর হোসেনের উদ্ভাবিত হিমাগার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সরজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে হিমাগারটি থেকে যদি কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় তাহালে জেলায় এই হিমাগার নির্মানে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হবে বলেও  জেলা প্রশাসক জানান। এই হিমাগারটির মাধ্যমে ২৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত আম সংরক্ষণ করা যাবে। আর এই হিমাগারটি নির্মাণে (প্রতি ৩ টনের  জন্য) খরচ পড়বে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর ২৯ হাজার ৫১০ হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় আড়াই লাখ মেট্রিক টন।  তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। স্থানীয় কৃষিবিভাগের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার কয়েক গুণ ছাড়িয়ে গেছে আমের পরিমাণ।


আরও পড়ুন- 

আমের সুবাসে বাজার মাতোয়ারা
চতুর্থবারের মতো সাতক্ষীরার আম ইউরোপের বাজারে রফতানি শুরু