খাগড়াছড়ি জেলায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার পাশাপাশি ১৫টি পাড়া-বন রক্ষায় পাঁচটি কৌশল গ্রহণ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ি জেলার ৬ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত পাড়া-বনের ওপর নির্ভর করে জীবন-যাপন করা পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৬৮৭। এসব পরিবার বনের ওপর নির্ভর করেই জীবন-যাপন করে আসছে। এই মানুষগুলোকে বনের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করে বন রক্ষাসহ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য এসআইডি-সিএইচটি-ইউএনডিপির সহায়তায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পরিবারগুলোর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ২ কোটি টাকা অনুদান বিতরণও করা হয়েছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বন ও বনের জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় পাঁচটি কৌশল অবলম্বন কর হচ্ছে। প্রথমত, এককালীন আর্থিক সহযোগিতা প্রদান। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মনিটরিং ব্যবস্থায় রেখে পরিবারগুলোর সদস্যদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল করার চেষ্টা। তৃতীয়ত, বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। চতুর্থত, মৌজা-বনে বসতি ও জুম চাষ নিষিদ্ধ করা। পঞ্চমত, প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করা।
এই পাঁচ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম দফায় পরিবার প্রতি ৭ হাজার টাকা করে মোট নগদ প্রায় ২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
জানা যায়, জেলায় মোট ১৫টি পাড়া-বন আছে। এর মধ্যে মাটিরাঙা উপজেলায় ৯০-একর আয়তনের পোমাং পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৯০, গুইমারা উপজেলায় ২০০ একর আয়তনের তিন্দুকছড়ি মৌজা-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৫৭, দিঘীনালা উপজেলায় ৩০০ একরের পাবলাখালী মৌজা-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৭১৫, ৮০ একরের নুনছড়ি মৌজা-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৬৮, ৮০০ একরের মধ্য ধনপাতা মৌজা-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ২২, ২৪০ একরের জারুলছড়ি-বাঘাইছড়ি মৌজা-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ১৩০, ১৫০ একরের ডানে ধনপাতা মৌজা-বনের উপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৯১, ৫০ একর আয়তনের বাঘাইছড়ি রবিচন্দ্র কার্বারী পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৬০, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ৩১৬ একরের কমলছড়ি মুখ পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ২৫৭, ৪০ একরের যাদুরামপাড়া বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৫৯, লক্ষিছড়ি উপজেলার ২০০ একরের নির্বোগযো পাড়া রিজার্ভ পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৫৬, ৫০ একরের দুরছড়ি পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৮২, ২০ একর আয়তনের বড়নীলীপাড়া পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৮৪, মহালছড়ি উপজেলার ২৬০ একরের উল্টাছড়ি বিহার পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৮০ এবং ৩০০ একরের করল্যাছড়ি সারনাথ বিহার পাড়া-বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা ৮৫৪টি।
এই ২ হাজার ৬৮৭ পরিবারের পুরো জীবন-জীবিকার একমাত্র মাধ্যম ছিলো এসব পাড়া-বন। এসব বনে থাকা কড়ই, জাম, চন্দন, মেহগনি, তেঁতুল, ডুমুর ও বাঁশসহ বিভিন্ন বনজ গাছপালা কেটে জীবন-যাপন করছিল। এছাড়াও বনমুরগি, বন্য শুকর, হরিণসহ নানা প্রজাতির পশু, পাখি ও কীটপতঙ্গ তাদের খাদ্য তালিকার অন্তর্ভূক্ত। দীর্ঘ সময় ধরে এসব পাড়া ও মৌজা বনের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো আর্থিক অনুদানের আওতায় আনা হয়েছে। কারণ তা নাহলে সংরক্ষিত এসব পাড়া ও মৌজা বনাঞ্চল রক্ষা করা সম্ভব হবে না এবং অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে সব পাহাড়ি গিরি-ঝিরি, ঝর্ণা, খাল, ছড়াসহ নানা পানির উৎসস্থল।
এ ব্যাপারে মধ্য ধনপাতা মৌজা-বন এর বাসিন্দা গোপাদেবী চাকমা বলেন, ‘ যুগ যুগ ধরে পূর্বপুরুষসহ বন-নির্ভর জীবন-যাপন করে আসছি। বর্তমানে বনজ সম্পদ কমে যাওয়ায় লোকজন কষ্ট পাচ্ছিল।’
খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘১৯৩৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি-১৯০০ এর এক সংশোধনীর মাধ্যমে মৌজা-বনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে পাড়া-বন সৌন্দর্য হারাচ্ছিল। এখন বন বাঁচলে, পরিবেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে।’
ইউএনডিপির জেলা ব্যবস্থাপক প্রিয়তর চাকমা বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ৪১ (এ) ধারা অনুযায়ী ঐতিহ্যবাহী মৌজা-বন সংরক্ষণের দায়িত্ব মৌজা প্রধানেরা পালন করে থাকেন। প্রতিটি মৌজায় ১ একর থেকে ১০০ একর বা তার চেয়েও অধিক পরিমাণ জায়গায় মৌজা-বন আছে। কিন্তু নানা কারণে মৌজা-বনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। হারানো মৌজা-বনগুলো ফিরিয়ে আনতে ইউএনডিপি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে।’
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যন কংজরী চৌধুরী বলেন, ‘বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার জন্য এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করে আসছিলো। বিশেষ করে পাড়া-বনগুলোর ওপর নির্ভর করে যেসব পরিবার বসবাস করে আসছিলো, তারা এখন বন হতে আগের মত বাঁশ, জ্বালানি কাঠ, বন্য প্রাণী, ফলদ ও বনজ সম্পদ পাচ্ছেন না। বনজ সম্পদ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। যেটুকু আছে তা সংরক্ষণের জন্য বন-নির্ভর বসবাসকারী পরিবারগুলোর তালিকা করে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে সুবিধাভোগীরা আয় বর্ধনমূলক কিছু করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘বনকে বাঁচাতে হবে, তাই বনের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না।’