১০ জুলাই প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই পাঁচ মেয়র প্রার্থী প্রচারে নামেন। এছাড়া প্রচারে নামেন ১০টি ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের ৫২ জন নারী কাউন্সিলর ও ৩০টি ওয়ার্ডের ১৬০ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী। প্রচারের সময় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীই। তারা নির্বাচন কমিশনে ৭৪টি অভিযোগও করেছেন। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৩টি ও বিএনপি ২১টি অভিযোগ দিয়েছিলেন।
সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভিযোগের তালিকা বড় হলেও নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না। তবে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ আমলে নেয়নি আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশন। অবশ্য এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আতিয়ার রহমান বলেছেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্র আমরা তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আবার অনেক অভিযোগের কোনও সত্যতা খুঁজে পাওযা যায়নি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমাদের ভূমিকা সবসময় দৃঢ় থাকবে। সব প্রার্থী আমাদের কাছে সমান।
ভোটারদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি লিটন ও বুলবুল রাজশাহীর উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০০৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এরপর রাজশাহীর চিরচেনা শহরকে উন্নয়ন করে বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাপক উন্নয়নের পরেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে অপপ্রচার ও নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নীরব ভূমিকা কিংবা অতি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন লিটন। এতে করে বিএনপির রাজশাহী মহানগর কমিটির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জয়ী হয়েও প্রতিপক্ষ দলের সরকার ক্ষমতায় থাকায় লিটনের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। অবশ্য এ ব্যাপারে মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ব্যর্থতা ও নিজের উন্নয়নকে তুলে ধরতে এবার এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নির্বাচনি স্লোগান ছিল- ‘আবারো বদলে দেই রাজশাহী’। এক্ষেত্রে সচেতন ভোটারদের সহানুভূতি পেয়েছেন জাতীয় চার নেতার অন্যতম এএইচএম কামারুজ্জামান হেনার সন্তান লিটন। অনেক ভোটারের মুখে শোনা গেছে, বুলবুল মেয়র ছিল। কিন্তু তার দল ক্ষমতায় না থাকায় সে রাজশাহীর উন্নয়ন করতে পারেনি। তাই তাকে আবার চেয়ারে বসিয়ে লাভ হবে না। অপরদিকে অনেক ভোটারের প্রশ্ন, বুলবুল যদি আবার মেয়র হয় আর সরকারের পটপরিবর্তন হয়, তাহলে লিটন জয়ী হলে রাজশাহীর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। ভোটারদের হিসাব-নিকাশের খেলায় আগামীর রাজশাহীর নগরপিতা তাহলে কে হচ্ছেন?
বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল প্রচারণায় তার অসমাপ্ত কাজগুলোকে সমাপ্ত করে ক্লিন সিটি, হেলদি সিটি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে গিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি এই নির্বাচনে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিজের নির্বাচনি ইশতেহারে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। যেটা নিয়ে স্থানীয় সুশীলসমাজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। এরপর মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেছেন, ‘দেশে আইনের কোনও শাসন নেই। প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে। এরপরও ভোটারদের সমর্থন আমার পক্ষে। বিজয়ী হলে যুবসমাজের জন্য কাজ করার পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবো। কিন্তু সরকারদলীয় নেতাকর্মী, প্রশাসনসহ অন্যদের ভূমিকা নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশয় রয়েছে। অবশ্য রাজশাহী বিএনপির ঘাঁটি। এখানে ভোট কারচুপি হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।’
এই নির্বাচনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকার পর নিজের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে তিনি আরও বলেছেন, আড়াই বছর জেলখানায় থাকার পর বাকি সময় চেয়ারে বসে সরকারের বিরূপমুখী আচরণের কারণে রাজশাহীবাসীর উন্নয়ন ঠিকমতো করতে পারেনি। তবে চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, বুলবুলের ব্যর্থতার কারণে রাজশাহীবাসী পাঁচ বছর পিছিয়ে গেছে। তাই আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। সরকার প্রধান উন্নয়ন করতে চান। আমি সে উন্নয়নের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হিসেবে রাজশাহীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। এজন্য আবার সিটি করপোরেশনের চেয়ারে বসার প্রার্থনা করি ভোটারদের কাছে। প্রচারণায় সবার অংশগ্রহণে নৌকার গণজোয়ার দেখে মনে হয়েছে আমার স্বপ্নের সঙ্গে রাজশাহীবাসী একমত আছেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত গতবার অপপ্রচার করে ভোটারদের বিভ্রান্তি করেছিল। এবারও তারা অপপ্রচার করেছে। কিন্তু নিজের ফাঁদে এবার তারাই পড়েছে। ককটেল বিস্ফোরণসহ ফেসবুকে গুলিবিদ্ধ বুলবুল, গ্রেফতার... কত কী অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রাজশাহীবাসী তাদের অপপ্রচার এবার কানে নেয়নি। আশা করি রাজশাহীবাসী উন্নয়নের স্বার্থে তাদের অপপ্রচারে কান দেবে না, এবার আর ভুল করবে না। প্রচার-প্রচারণা করে নৌকার জোয়ার দেখে সেটাই এবার মনে হয়েছে । তবে নির্বাচনের আগের রাতে বিএনপির প্রার্থী আবারও কোনও গুজব ছড়ায় কিনা তা নিয়ে উদ্বেগে আছি।’
লিটন মেগাসিটি গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবার নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। সেখানে তিনিও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নগরীর হোলিং ট্র্যাক্স কমনো, বাড়িতে আবারও গ্যাস সংযোগসহ বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তাই গতবারের পরাজয়ের পর থেকেই পরিকল্পনামাফিক একচেটিয়া নির্বাচনি কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। তাই প্রত্যশা মতোই সবকিছুই হওয়ায় জয়ের ব্যাপারে খুবই আত্মবিশ্বাসী লিটন।
লিটন ও বুলবুল ছাড়াও মেয়র পদে এবার প্রার্থী হয়েছেন গণসংহতি আন্দোলনের রাজশাহী জেলার সমন্বয়ক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ মোর্শেদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমান।
প্রচার-প্রচারণার বিভিন্ন সময়ে পাঁচ মেয়র প্রার্থী একসঙ্গে ভোটারদের মুখোমুখি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আগামীতে নির্বাচিত হলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় নানান প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।