২০১৪ সালে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর বদলে যায় দৃশ্যপট। ঠাকুরগাঁও বিজিবির তদারকিতে ‘আলোকিত সীমান্ত’ নামের কর্মসৃজন একটি প্রকল্প চালু হয়। এরপর থেকে পাল্টে গেছে স্থানীয় গরু চোরাকারবারিদের জীবন।
এখন সীমান্ত এলাকায় বিজিবির তৎপরতা তেমন দেখা যায় না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া কেটে ভারতের ওপার থেকে গরু পার করে আনার ঘটনাও কমেছে। বিজিবি প্রতিষ্ঠিত ফার্ম থেকে পোষা গরু নিয়ে ঈদের বাজারে বিক্রি করে রোজগার করছেন অনেকেই। অথচ গত কয়েক বছর আগের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম।
যে ঘটনা পাল্টে দেয় দৃশ্যপট
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার শুটকা বস্তি গ্রামের দরিদ্র শের আলীর ছেলে শাহ আলম। শুধু বাবার রোজগারে চলছিল না সংসার। এদিকে বাড়িতে বিয়ের উপযুক্ত দুই বোন। পরিবারের দৈন্যদশা চিন্তা থেকে শাহ আলম এলাকার গরু চোরাকারবারিদের সঙ্গে ওপারে (ভারত) যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে গরু আনতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার। বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারায় অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এ কিশোর। ঘটনাটি ২০১৪ সালের ১৯ নভেম্বরের। পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের সময় বিজিবি ঠাকুরগাঁও ৩০ ব্যাটালিয়নের তৎকালীন অধিনায়ক লে.কর্নেল তুষার বিন ইউনুস আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তিনি বিকল্প কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন।
আলোকিত সীমান্ত’ কর্মসৃজন প্রকল্প
স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা অনুদানের ৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫শ ২২ টাকা মূলধন নিয়ে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল। এ প্রকল্পে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করেছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও। বিজিবির উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের আঞ্চলিক কমান্ডার (রংপুর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহফুজুর রহমান এই প্রকল্পের উদ্ধোধন করেন। এলাকার ২৩টি পরিবারের ৮০ জন সদস্য এই প্রকল্প থেকে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। কর্মসুচিতে গরুর খামার, হাঁস মুরগি ও কবুতর পালন, মাশরুম চাষ, মৌমাছি চাষ, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, জৈব সার তৈরি, ফল ও ঔষধি গাছ উৎপাদন ও সবজি চাষ, কুটির শিল্পসহ নানা প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্ক স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্পের সুফল মিলছে
এই প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহ আলমের বাবা শের আলী বলেন, ‘ছেলেটি নেই কিন্ত আয়ের পথ তৈরি করে গেছে। আজ ছেলেটা বেঁচে থাকলে কতটাই খুশি হতো।’ এই বলে শের আলী বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, ‘বিজিবির উদ্যোগ এলাকায় সাড়া ফেলেছে। প্রকল্প থেকে সুবিধা পাওয়ায় অনেক চোরাকারবারি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে।’
এক সময় গরু চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি আগে সীমান্তের ওপারে গিয়ে চোরাই পথে গরু আনতাম। এখন ওপারে আমাদের গ্রামের কেউ যায় না। বিএসএফের গুলি খাওয়ার আর ভয় নাই। অনেক ভালো আছি পরিবার নিয়ে।’
জয়নুল হক নামের আরেকজন বলেন, ‘আমার পরিবারের অনেকে চোরাচালানের সঙ্গে এক সময় জড়িত ছিল। ১২ বছর আগে বিএসএফের গুলিতে আমার বড় ভাই মারা যায়। পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে পড়ে। বিজিবির উদ্যোগে আমরা পরিবারের সবাই চোরাচালান বন্ধ করে সৎ পথে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। এখন নিজ জমিতে সবজি চাষ, গরু পালন ও মাছ চাষ করি।’
প্রকল্পের বিষয়ে বর্তমানে বিজিবির ঠাকুরগাঁও -৫০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘সবার সহযোগিতা পেলে জেলার সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারলেই এ রকম কাজের সুফল মিলবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন চোরাকারবারিরা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, একটা গরু আনতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে নিজেদের পোষা গরু বাজারে বিক্রি করে লাভবান হওয়া অনেক সম্মানের।’
তিনি জানান, বিজিবি শুধু সীমান্ত পাহারাই দেবে না, সীমান্তবাসীর নৈতিকতা উন্নয়নেও জোর দেবে এবং সে ব্যাপারে সব ধরনের সহযোগিতা করবে।