রোহিঙ্গা সংকট: প্রত্যাবাসনে গতি নেই

রোহিঙ্গা জীবন

আজ ২৫ আগস্ট। রোহিঙ্গা সংকটের এক বছর পূর্ণ হলো। ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় শহর মংডুতে বসবাসকারী মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর আগ্রাসন চালায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও উগ্রপন্থী মগরা। সেখানকার একটি সেনা ঘাঁটিতে কথিত বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান স্যালভেশন আর্মি ‘আরসা’র হামলার অজুহাতে এই অভিযান চালায় তারা। সেসময় গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের সীমান্তে ঢল নামে রোহিঙ্গাদের। ২৫ আগস্ট মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেয় বাংলাদেশ সরকার। এরপর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। সাত লাখের অধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে।

এসব রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও নানা কাজের সুবিধার্থে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন শুরু করে সরকার। জানা যায়, সর্বশেষ নিবন্ধন অনুযায়ী নতুন-পুরাতন মিলে নিবন্ধন করেছে ১১ লাখ ১৬ হাজার ৪১৭ জন  রোহিঙ্গা। তবে উখিয়া ও টেকনাফসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ৩ থেকে ৪ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করে আসছে। এসব রোহিঙ্গা পরিবারগুলো নিবন্ধনের আওতায় আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কীভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন করা যায় সেই ব্যাপারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক বিশ্ব ও বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু প্রত্যাবাসনের কোনও প্রক্রিয়াই এখনও সেভাবে চোখে পড়েনি। ছোট পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোন গতি নেই  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায়।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমঝোতা চুক্তির পর এই বছরের জুন মাসে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনএইচসিআর’র সঙ্গেও একটি চুক্তি সই করেছে মিয়ানমার। এতদিন কোনভাবে বাগে আনা না গেলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের আগের বাসস্থানে ফেরাতে ‘স্বেচ্ছা, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি’ পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘ এবং মিয়ানমার-উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। ইউএনএইচসিআর ও জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সঙ্গে এই চুক্তি করেছে মিয়ানমার। চুক্তি অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ইউএনএইচসিআর ও ইউএনডিপি সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছে।

শরণার্থী ক্যাম্প থেকে নিজ দেশে ফেরার আশা রোহিঙ্গাদের মনেও

এছাড়াও গত মাসের শেষের দিকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও রুদ্ধদ্বার আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, মহাসচিবের বিশেষ দূত, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফরের পর রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ উত্থাপন করেছেন নিরাপত্তা পরিষদে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভন্ন মহলের চাপ অগ্রাহ্য করে মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রথম থেকেই টালবাহানা করে যাচ্ছে। গত এপ্রিলে ১১ লাখ রোহিঙ্গা থেকে প্রথম দফায় দেওয়া ৮ হাজার ৩২ জনের তালিকা থেকে মাত্র ৫৫৯ রোহিঙ্গাকে নিজেদের নাগরিক বলে স্বীকার করে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের অনীহা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নে ইচ্ছার অভাব রয়েছে। মিয়ানমার পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে দিতে তৎপর ছিল। ভারত, চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে বিগত বছরগুলোয় আমাদের প্রায় বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। অথচ দেশগুলো বাংলাদেশের এমন দুর্দিনে অবন্ধুসুলভ আচরণ করেছে।’

আন্তর্জাতিক শরণার্থী বিশ্লেষক আসিফ মুনির বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়টি সবচেয়ে জটিল। বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা শিবির কিন্তু কক্সবাজারে। কাজেই আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ওপর দৃষ্টি পড়েছে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যেভাবে আন্তর্জাতিকভাবে দৃষ্টি পড়ার কথা, সেভাবে পড়েনি। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কম চেষ্টা করেনি। তবে দেশের নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা মিলে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর জোরালোভাবে চাপ বাড়াতে হবে।’

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর কক্সবাজার কার্যালয়ের প্রধান সংযুক্তা সাহানি বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকে আজ এক বছর ধরে আইওএম রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছে। সরকারের সাথে সমন্বয় রেখে রোহিঙ্গাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে আইওএম। আমাদের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে।’

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের তরফ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে। তবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, জীবিকা, অবাধ চলাচল, শিক্ষাসহ যেসব মৌলিক অধিকার রয়েছে, সেসব বিষয় নিশ্চিত করতে মিয়ানমার বিলম্ব করছে। অবশ্য মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে খুব দ্রুত মিয়ানমারের একটি দল বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।’