আটক সোহেলকে ছাড়িয়ে নিতে কেন থানা ঘেরাও?

মো. সোহেল নামের এক আসামিকে আটক করায় থানা ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটে দিনাজপুরে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে। ঘেরাওকারীরা দাবি  করেছিল, আসামিকে আটক করার সময় তার সঙ্গে অস্ত্র ছিল না। তবে পুলিশ বলছে, আটক সোহেল চিহ্ণিত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দু’টি মামলা রয়েছে। পাশাপাশি মাদক ব্যবসার সঙ্গেও সে জড়িত সে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরাও বলছেন, সোহেল সন্ত্রাসী। চাপ প্রয়োগ করেই এলাকাবাসীকে থানা ঘেরাওয়ে বাধ্য করা হয়।  

দিনাজপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ উজ্জামান আশরাফ সাংবাদিকদের জানান, ‘সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিনাজপুর শহরের কোলঘেঁষা পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা রেলব্রিজ এলাকার উচার মোড় থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মো. সোহেলকে আটক করা হয়। সে দপ্তরীপাড়া গ্রামের মৃত রশিদ খালাসীর ছেলে। তার কাছ থেকে আমেরিকার তৈরি একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এসময় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা করে সোহেলকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।’

সোহেলের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের অস্ত্র আইনে একটি মামলা রয়েছে এবং সে ২০১৩ সালের তোফাজ্জল হত্যা মামলার আসামি বলেও জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ উজ্জামান আশরাফ। তিনি জানান, এই অভিযানে তিনি নিজে এবং সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার ও কোতোয়ালি থানার ওসি রেদওয়ানুর রহমান নেতৃত্ব দেন। সন্ত্রাসীদের হামলায় পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার ও ওসি রেদওয়ানুর রহিম আহত হন। পরে পুলিশের পিকআপ ভ্যানের গতিরোধ করারও চেষ্টা করে এলাকার লোকজন।

‘অস্ত্রসহ’ একজনকে আটকের ঘটনায় থানা ঘেরাও, পুলিশের লাঠিচার্জ

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ উজ্জামান আশরাফ বলেন, ‘কারা এভাবে সরকারি কাজে বাধা দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা সূত্রে জানা যায়, আটক সোহেলের বিরুদ্ধে ওই থানায় দুটি মামলা রয়েছে। ২০১৩ সালে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সোহেল। ওই বছরের ২৯ আগস্ট কোতোয়ালি থানায় ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩০২/৩৪/১১৪ পেনাল কোড-১৮৬০-এ দায়ের করা মামলা নং-৭৭/১৩। একইসঙ্গে সোহেলের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর একটি মামলা রয়েছে। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ)/১৯ (এফ) ধারায় দায়ের করা মামলা নং-২০।

সোহেলকে আটক করে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে আসা হলে সোমবার রাত ৮টার দিকে এলাকার লোকজন জড়ো হতে থাকে। সোয়া ৮টার দিকে দপ্তরীপাড়া, হটাৎপাড়া, পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা ও উচার মোড় এলাকার শতাধিক লোকজন কোতোয়ালি থানা ঘেরাও করেন। তারা দাবি করেন, সোহেলের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। পুলিশ তাকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ রাত সাড়ে ৯টায় লাঠিচার্জ করে। এ সময় কোতোয়ালি থানায় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে পুলিশের সামনেই আটক মো. সোহেল চিৎকার করে বার বার বলতে থাকেন, যে অস্ত্রসহ তাকে আটক করা হয়েছে সেই অস্ত্র তার কাছে ছিল না।

আটকের সময় সোহেলের কাছে অস্ত্র ছিল কি না এ বিষয়টি এলাকাবাসীর কাছে পরিষ্কার না হলেও এলাকার লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সোহেল একজন সন্ত্রাসী। তিনি মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

সোহেলকে আটকের বিষয়ে মঙ্গলবার এলাকায় যাওয়া হলে সাংবাদিক জেনে উচার মোড় এলাকার বেশ কয়েক যুবক তেড়ে আসে। তারা অভিযোগ করে, সাংবাদিকরা পত্র-পত্রিকায় যা লিখেছেন তা সত্য নয়। সোহেল দুই দিন আগে একটি মামলায় জামিনে বের হয়েছেন। ওই মামলাটিও মিথ্যা মামলা দাবি করে তারা জানায়, সোহেলকে ফাঁসানো হচ্ছে।

তবে এলাকার অনেকেরই (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ, সোহেল এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। তার সঙ্গে বড় বড় ব্যবসায়ীদের আঁতাত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকার অনেকেই অতিষ্ঠ। রাতে যারা থানায় গিয়েছিল তারা স্বপ্রনোদিতভাবে নয়, বরং চাপের মুখে যেতে বাধ্য হয়। স্থানীয়রা আরও জানান, সোহেলের প্রতি এলাকার অনেক লোকজনেরই ক্ষোভ রয়েছে। তবে প্রকাশ করতে সাহস পান না কেউ। কারণ কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো আবার এলাকায় ফিরে আসবে সোহেল। তাই ভয় রয়েছে সবারই মনে।

‘অস্ত্রসহ’ একজনকে আটকের ঘটনায় থানা ঘেরাও, পুলিশের লাঠিচার্জ

এলাকার লোকজন ভয়ে মুখ খোলে না বিষয়টি স্বীকার করেছেন জনপ্রতিনিধিরাও। সোহেল যে স্থানে আড্ডা দেন ও ব্যবসা পরিচালনা করেন তা দিনাজপুর পৌরসভার ১০ নং ওয়ার্ডে। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সিকদ্দারাতুল ইসলাম বাবু জানান, ‘সোহেলসহ তার সঙ্গপাঙ্গরা ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ব্রিজের মাদকের ব্যবসার পাশাপাশি এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে সে। বিষয়টি এলাকার অনেকেই জানে। তবে সোমবার রাতে যে ঘটনা সেটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানি না।’ এলাকায় মাদক ব্যবসা হলেও পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আটক সোহেল আমার এলাকায় থাকে না। সে ১১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ১১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আহমেদুজ্জামান ডাবলু জানান, ‘সোহেলের দাপটে এলাকার কেউ কিছু বলতে পারে না। লোকজন সবাই সোহেলকে ভয় পায়। সোহেল এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বিষয়টি একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।’

দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নাজমুল আহমেদ জানান, ‘আটক সোহেল একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। সোমবারের ঘটনায় অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ নিয়ে এখন তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা। এলাকাবাসীর হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। আটক সোহেলকে আদালতে পাঠানো ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে। তবে থানা ঘেরাওয়ের ঘটনায় কোনও মামলা বা জিডি হয়নি।’

আরও পড়ুন- ‘অস্ত্রসহ’ একজনকে আটকের ঘটনায় থানা ঘেরাও, পুলিশের লাঠিচার্জ