এলাচ চাষে রেজাউলের স্বপ্ন পূরণ

এলাচ গাছের পরিচর্যা করছেন রেজাউল ইসলামমসলা জাতীয় ফসল এলাচ চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার নতুন চুলিয়ার চর গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম। তার দাবি, এলাচ (ছোট ও বড়) চাষ করে দেশে তিনিই প্রথম সফলতা পেয়েছেন। নিজের সাফল্যের পর পাশের গ্রামের কৃষকদের মাঝে এলাচের চাষ ছড়িয়ে দিতে ‘স্বপ্ন জয়’ নামের একটি নার্সারিতে চারা উৎপাদন করছেন তিনি। রেজাউলের স্বপ্ন, দেশব্যাপী তিনি এলাচ চাষ ছড়িয়ে দেবেন, যাতে এলাচ চাষে দেশ স্বনির্ভর হয়ে ওঠে।

রেজাউল ইসলাম জানান, আট বছর আগে রোপণ করা দুটি চারা থেকে এখন প্রায় দুই হাজারেরও বেশি এলাচ চারা উৎপাদনে সক্ষম ‘স্বপ্ন জয়’ নামে তার নার্সারি। এছাড়া, গত কয়েক বছরে লক্ষাধিক টাকার চারা ও এলাচ বিক্রি করেছেন রেজাউল।

ছড়া বাধা এলাচএলাচ চাষ শুরুর গল্প বলতে গিয়ে রেজাউল বলেন, ‘২০০৭ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় পরিচয় হয় আব্দুর রহমান নামে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের সঙ্গে। শ্রীলঙ্কার ওই নাগরিক এলাচ চাষ করে তার স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প আমাকে শোনান। এরপর আমি এলাচ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠি। ২০০৮ সাল ইজতেমায় আসার সময় শ্রীলঙ্কার ওই নাগরিক আমার জন্য এলাচের দুটি চারা নিয়ে আসেন। ওই চারা বাড়িতে এনে রোপণ করি। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিনের মধ্যে চারা দুটি প্রায় শুকিয়ে যায়। আব্দুর রহমানের কাছে ফোনালাপের পর চারার গেড়ায় পানি ঢালতে থাকি। ৩/৪ মাস পর চারা দু’টির গোড়া থেকে নতুন কুঁড়ি বের হতে শুরু করে। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই দুটি চারা থেকে আমি এখন দুই হাজারেরও বেশি এলাচ চারার মালিক।’

এলাচের গাছস্বপ্ন জয় নার্সারির মালিক রেজাউল বলেন, ‘চারা লাগানোর পর গত বছর থেকে আমি এলাচের ফল পেতে শুরু করেছি। তবে এখন চারা উৎপাদনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছি। সাধারণত এলাচ চারার বয়স ২/৩ বছর হলেই ফলন শুরু হয়। অনেকটা আদা গাছের মতো এলাচের একটি গাছের কন্দ (রাইজম) বা গোড়া থেকে প্রায় ২০টি গাছ জন্ম নিতে পারে। চার থেকে ছয় মাস বয়সী একটি চারা সরিয়ে অন্য জায়গায় লাগালে তার গোড়া থেকে আবারও নতুন চারা জন্ম নেয়। এভাবে আমার নার্সারিতে বর্তমানে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি চারা উৎপাদিত হয়েছে।’

রোদে শুকানো হচ্ছে এলাচের ফলএলাচ চাষের বিষয়ে রেজাউল জানান, বর্তমানে তার নার্সারিতে প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে এলাচের ছড়া বেরিয়েছে। প্রত্যেকটি ছড়ায় কাঁচা এলাচ রয়েছে। প্রতিটি ছড়া শুকানোর পর সেখান থেকে ৩৫ থেকে ৫০টি পর্যন্ত এলাচ পাওয়া যায়। তিনি আরও জানান, এক শতক জমিতে ১০ থেকে ১৫টি চারা রোপন করে সেখান থেকে এক হাজারেরও বেশি চারা তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে তার নার্সারি ও বাড়িতে মিলে প্রায় একহাজার গাছে ফল এসেছে।

রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘আমি চাই, এই এলাচ চাষ দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতে ছড়িয়ে পড়ুক। এতে করে দেশে মসলা আমদানি নির্ভরতা কমে গিয়ে মসলা উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।’
রেজাউল ইসলামের স্বপ্নজয় নার্সারিরেজাউলের সহযোগী স্ত্রী মর্জিনা আক্তার জানান, তারা এখন নিজেদের গাছে উৎপাদিত এলাচই তরকারিতে ব্যবহার করছেন। আর নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট এলাচ বাজারে বিক্রি করছেন।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান বলেন, ‘আমি রেজাউল ইসলামের ‘স্বপ্ন জয়’ এলাচ চাষ প্রকল্প সরেজমিনে ঘুরে দেখেছি। তিনি এলাচ চাষে সফলতা দেখিয়েছেন। তার এ প্রকল্প গোটা জেলার পাশাপাশি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। কৃষি বিভাগ রেজাউলকে সার্বিক সহযোগিতা করবে।’

এলাচের ফলরেজাউলের নার্সারিতে মসলা উৎপাদনের খবরে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘আমি খুব তাড়াতাড়ি তার নার্সারিতে এলাচের চাষ দেখতে যাবো। তাকে যতরকমের সরকারি সহায়তা দেওয়া সম্ভব তার সবটাই দেওয়ার ব্যবস্থা করবো, যাতে করে তিনি তার মসলা চাষের সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে।’